বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলোতে অতিরিক্ত মূল্যায়ন কাঠামোগতভাবে যুক্ত রয়েছে বলে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি আজ প্রকাশ করেছে। ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে এই অতিরিক্ত খরচগুলো সরকারী ব্যালান্সে স্থায়ী দায়বদ্ধতা রূপে রূপান্তরিত হয়েছে।
কমিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে (PPA) উৎপাদন না হলেও ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট অর্থপ্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, বিদ্যুৎ প্রয়োজন না হলেও ‘টেক-অর-পে’ ধারা প্রয়োগের ফলে গ্রাহককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
এই চুক্তিগুলোতে জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তন, মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকি, বিদেশি মুদ্রা সূচক এবং সার্বভৌম গ্যারান্টি সবই সরাসরি সরকারী ভোগে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে বেসরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থিতিশীল রিটার্ন নিশ্চিত করা হয়েছে, আর ঝুঁকি পুরোপুরি জনগণের ওপর নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
কমিটি উল্লেখ করেছে, এই ধরনের ঝুঁকি স্থানান্তর এবং নির্ধারিত পেমেন্টের ধারা দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বের ওপর বড়ো চাপ সৃষ্টি করে। ২০‑২৫ বছরের চুক্তি মেয়াদে এই অতিরিক্ত ব্যয়গুলো আর্থিক দায়বদ্ধতা হিসেবে স্থায়ী হয়ে থাকে, যা ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
আজ বিকাল বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কমিটি এই ফলাফল উপস্থাপন করেছে। উপস্থিত কর্মকর্তারা চুক্তির কাঠামো ও আর্থিক প্রভাবের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন।
বিশেষভাবে, কমিটি জানিয়েছে যে আদানি গ্রুপের ভারতীয় বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির ট্যারিফ একই সময়ের অন্যান্য চুক্তির তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল এবং দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে উচ্চ খরচ স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করেছে।
কমিটির মতে, এই অতিরিক্ত ট্যারিফ কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক ফল নয়, বরং নির্দিষ্ট চুক্তিগত শর্তের ফল। তাই ক্রস‑বর্ডার বিদ্যুৎ লেনদেনে উচ্চ মূল্যের মূল কারণ চুক্তির নকশা, না যে বাজারের মৌলিক গঠন।
অন্যান্য বড় প্রকল্পের চুক্তিগুলোর বিশ্লেষণে একই রকম ঝুঁকি বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণের ধারা পাওয়া গেছে। ফলে এটি একক ঘটনা নয়, বরং পুরো সেক্টরে প্রণালীগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
কমিটি এখন থেকে ক্ষমতা সম্প্রসারণের চেয়ে শাসনব্যবস্থার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে। নতুন প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারকে ডিফল্ট পদ্ধতি হিসেবে পুনঃপ্রবর্তন এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুনির্দিষ্টভাবে, সব বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সংশোধনী এবং পেমেন্টের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই তথ্যের উন্মোচন বাজারে বিশ্বাস বাড়াবে এবং ভবিষ্যৎ চুক্তিতে অনুকূল শর্তের ভিত্তি গড়ে তুলবে।
ভবিষ্যৎ চুক্তিতে ঝুঁকি পুনর্বণ্টনের জন্য ন্যায়সঙ্গত শর্ত প্রণয়ন এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া, চলমান দুর্নীতি তদন্তকে ত্বরান্বিত করে অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহ এবং সৎ নীতিতে পুনঃআলোচনার পথ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই রিফর্ম পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভার হ্রাস পাবে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে। দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপগুলো দেশের শক্তি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।



