রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট বাজেট আজ এক নতুন প্রস্তাবের মাধ্যমে ২৫,৫৯৩ কোটি টাকার বৃদ্ধি পাবে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৩৮,৬৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছাবে এবং সমাপ্তির লক্ষ্য বছর ২০২৮ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া হবে। এই পরিবর্তনটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সামনে উপস্থাপিত হবে।
প্রস্তাবটি আজই উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত, যেখানে বৈঠকের প্রধানসভা চেয়ার করবেন চিফ অ্যাডভাইজার ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস। অনুমোদিত হলে প্রথম সংশোধনী হিসেবে ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পের খরচ ১১৩,০৯২ কোটি টাকার মূল বাজেট থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়বে। মূল সমাপ্তির সময়সীমা ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, যা এখন ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পটি ২০১৬ সালে অনুমোদিত হয় এবং প্রায় নব্বই শতাংশ তহবিল রাশিয়ার নরম ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনায় টাকার মান ১ ডলার প্রতি ৮০ টাকার ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের সময় টাকার মানে ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ঘটেছে, যা ব্যয়ের বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, ব্যয়বৃদ্ধির প্রধান কারণ হল প্রকল্পের উপাদানগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং নতুন দশটি উপাদান যোগ করা। মোট ৩৮টি উপাদানের জন্য আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে গ্রিন সিটি নামে পরিচিত আবাসিক ব্লকের সম্প্রসারণও অন্তর্ভুক্ত। দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা উদ্ভব হওয়াও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প হওয়ায় পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাবের ফলে রক্ষণাবেক্ষণ, স্পেয়ার পার্টস এবং পরামর্শ সেবার খরচ যথাযথভাবে অনুমান করা যায়নি। এই ঘাটতি প্রকল্পের মোট ব্যয়কে অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, প্রাথমিক অগ্রিম পেমেন্ট, কাস্টমস ডিউটি এবং ভ্যাটের জন্য নির্ধারিত তহবিলও শেষ হয়ে গেছে।
মুদ্রা হারের পরিবর্তন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; ২০১৬ সালে ডলার এক্সচেঞ্জ রেট ছিল ৮০ টাকা, যা এখন ১২২.৪০ টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিবর্তনটি প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে রাশিয়ান ঋণ ও সরবরাহের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
কোভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কিছু রাশিয়ান ব্যাংকের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রকল্পের সময়সূচি ও ঋণ চুক্তিতে বিলম্বের কারণ হয়েছে। এসব বাহ্যিক শক প্রকল্পের নির্মাণ সময়সীমা বাড়িয়ে দেয় এবং ঋণ শর্তাবলীর পুনর্নবীকরণকে বাধ্য করে। ফলে প্রকল্পের আর্থিক ও সময়সূচি দুটোই প্রভাবিত হয়েছে।
প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, অতিরিক্ত চাহিদা এবং মুদ্রা হারের ওঠানামা আর্থিক পরিকল্পনাকে পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। নতুন বাজেট প্রস্তাবে এই সব পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর্থিক ঘাটতি না দেখা যায়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যয়বৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর চাপ বাড়াবে। যদিও প্রকল্পের সম্পন্ন হওয়ার সময়সীমা বাড়লেও, শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক শক্তি দেশের জ্বালানি মিশ্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে মুদ্রা হারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়াতে পারে। তাই সরকারকে আর্থিক রিজার্ভ শক্তিশালী করে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে চলা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যয়বৃদ্ধি এবং সময়সীমা পরিবর্তন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে। তবে সংশোধিত বাজেট ও সময়সূচি অনুমোদিত হলে, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা অর্জনের সম্ভাবনা বজায় থাকবে।



