ইসলামাবাদী রাষ্ট্রের এক উচ্চ আদালত সামাজিক মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ পোস্টের অভিযোগে মানবাধিকার কর্মী ইমান মাজারি এবং তার স্বামী হাদি আলি চাত্তাকে মোট সতেরো বছর জেল শাস্তি প্রদান করেছে। উভয়ই আইনজীবী এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রকাশিত পোস্টের ভিত্তিতে দায়ী করা হয়েছে।
মাজারি ও চাত্তা দুজনকে তিনটি আলাদা অভিযোগে যথাক্রমে পাঁচ, দশ ও দুই বছরের শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। যদিও শাস্তিগুলি পৃথক, আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে তারা একসাথে সেগুলো পালন করবে, ফলে দশ বছর পরই তাদের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শাস্তির পাশাপাশি প্রতিটি দণ্ডভোগীকে ৩ কোটি ৬০ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। এই অর্থের পরিশোধের দায়িত্বও তাদের ওপরেই থাকবে। জরিমানা ও শাস্তি একত্রে তাদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত অবস্থাকে কঠিন করে তুলবে।
দায়ের মূল বিষয় ছিল সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রকাশিত পোস্ট, যেগুলোতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদী’ লেবেল আরোপের অভিযোগ করা হয়েছিল। আদালত উল্লেখ করেছে যে এই পোস্টগুলো ‘রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসীদের’ এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মাজারি ও চাত্তা উভয়ই এই অভিযোগকে রাজনৈতিক দমনমূলক কৌশল হিসেবে দেখেছেন। তারা দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী কর্মীদের অদৃশ্য হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার ফলে তারা আইনি নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা সেনাবাহিনীর ওপরও দায় আরোপের চেষ্টা করলেও, সামরিক বাহিনী এই অভিযোগকে অস্বীকার করেছে।
অভিযোগিতদের মা, শিরিন মাজারি, যিনি পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্ত্রিসভা সদস্য ছিলেন, রায়কে ‘অবৈধ’ বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাদের পক্ষে যথাযথ প্রতিরক্ষা উপস্থাপনের সুযোগই প্রদান করা হয়নি। এই মন্তব্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা ইতিমধ্যে এই মামলাকে দেশের নাগরিক অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের সংকোচনের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২৪ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে এই ধরনের শাস্তি নাগরিক সমাজের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘কৌঁসুলির’ (অভিযুক্তের) অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, যদিও এই বাক্যাংশের সুনির্দিষ্ট অর্থ স্পষ্ট নয়। তবে রায়ের ভিত্তি মূলত পোস্টের বিষয়বস্তু এবং সেগুলোর ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।
দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের সুযোগ আছে কি না, তা বর্তমানে স্পষ্ট নয়। যদি আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তারা তা গ্রহণ করবে কিনা, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। আপিল প্রক্রিয়া চললে মামলার পরবর্তী ধাপগুলোতে নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে।
পাকিস্তানের সাইবার ক্রাইম আইন, যা এই মামলায় প্রয়োগ করা হয়েছে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্কের বিষয়। সমালোচকরা বলেন, এই আইনটি মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করতে ব্যবহৃত হতে পারে। আদালত এই আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত করা ব্যক্তিদের শাস্তি কঠোর করে তুলেছে।
সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এই রায়ের প্রতি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে পূর্বে তারা একই ধরনের অভিযোগকে অস্বীকার করেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা আবারও প্রকাশ পেয়েছে।
মামলার পরবর্তী পর্যায়ে, যদি আপিল করা হয়, তবে উচ্চতর আদালতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা হতে পারে। আপিলের ফলাফল দণ্ডের পরিমাণ, জরিমানার পরিমাণ এবং দোষী সাব্যস্তের বৈধতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করতে পারে।



