হেক্সিং কোম্পানি পুনরায় বাংলাদেশে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ১৯ অক্টোবর ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে চিঠি জারি করে হেক্সিংকে কালোতালিকাভুক্ত দেশগুলোতে উপস্থিতি ও দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে সতর্ক করেছে। পূর্বে একই কোম্পানি গত সরকারকালে চক্রবদ্ধ ব্যবসা করে শত শত কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন করেছিল এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের হলেও আওয়ামী লীগ শাসনে সেসব মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এখন হেক্সিং আবার নতুন দরপত্রে সক্রিয় হওয়ায় বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
হেক্সিং ২০১৯-২০২১ সময়কালে সরকারী মিটার সরবরাহ চক্রে প্রবেশ করে চীনের মূলধনসহ যৌথ উদ্যোগ গঠন করে সরাসরি মিটার বিক্রি করত। দরপত্র ছাড়াই লেনদেনের ফলে বিশাল আর্থিক লভ্যাংশ অর্জিত হয় বলে অভিযোগ উঠে। এই সময়ে অর্থ পাচারের ভিত্তিতে একাধিক মামলা দায়ের হলেও পরবর্তীতে সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়, যা আওয়ামী লীগ শাসনের অধীনে ঘটেছিল।
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে হেক্সিংকে ভারত, নেপাল, কেনিয়া সহ কয়েকটি দেশে কালোতালিকাভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মিটার সরবরাহে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ পাচারের নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হেক্সিংকে অব্যাহতি প্রদান এবং ওজোপাডিকোর সব মামলা তুলে নেওয়ার সুপারিশও উল্লেখ করা হয়েছে।
মিটার ক্রয় সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তের জন্য গত বছরের মার্চে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কয়েকটি সুপারিশ প্রকাশ করে, যার মধ্যে হেক্সিংয়ের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত। তবে কমিটির সুপারিশ সত্ত্বেও হেক্সিং এখনও দরপত্রে অংশগ্রহণ চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুরের ওজোপাডিকো বিভাগে ১,৩৮,০০০ মিটারের সরবরাহের জন্য দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই দরপত্রে মোট ছয়টি কোম্পানি অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে হেক্সিংও অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয় দফায় অতিরিক্ত ৫১,০০০ মিটারের দরপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলমান, যেখানে হেক্সিং পুনরায় অংশগ্রহণ করেছে।
হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে বর্তমানে দুইটি মামলা অব্যাহত রয়েছে এবং আদালতের চূড়ান্ত অব্যাহতি না পাওয়া পর্যন্ত কোম্পানিটিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অব্যাহতি প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং মামলাগুলো পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হেক্সিংয়ের পুনরায় বাজারে প্রবেশ বিদ্যুৎ মিটার সরবরাহের প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একদিকে বড় পরিমাণের সরবরাহে দাম কমে গ্রাহকের সুবিধা বাড়তে পারে, অন্যদিকে কালোতালিকাভুক্ত কোম্পানির অংশগ্রহণ ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এই দ্বিমুখী প্রভাব বিনিয়োগকারী ও বিতরণ সংস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি হেক্সিংয়ের সঙ্গে কোনো লেনদেন না করার নির্দেশ মেনে চলা না হলে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে, মিটার সরবরাহের জন্য স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়েছে। বাজারে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হেক্সিংয়ের আইনি অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তার অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভবপর বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।
সারসংক্ষেপে, হেক্সিংয়ের মিটার ব্যবসায় পুনরায় সক্রিয়তা বিদ্যুৎ খাতের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির লেনদেনের উপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা এবং স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের গুণগত মান রক্ষার মূল চাবিকাঠি।



