মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীর কাজের প্রশংসা করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন। ট্রাম্পের টুইট‑সদৃশ পোস্টে তিনি ব্রিটিশ সৈন্যদের ‘সেরাদের সেরা’ বলে উল্লেখ করে, আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়ে ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সৈনিকের মৃত্যু ও বহু আহতের কথা তুলে ধরেছেন। একই পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্র‑যুক্তরাজ্য সম্পর্ককে অটুট বন্ধন হিসেবে বর্ণনা করে, দু’দেশের সামরিক সহযোগিতার প্রতি গভীর স্নেহ প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের আগে, ন্যাটো‑সংযুক্ত সামরিক জোটের আফগানিস্তান যুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি যুক্তি দেন, মার্কিন মিত্ররা যুদ্ধের সামনের সারিতে লড়াই করেনি এবং ন্যাটো‑সদস্য দেশগুলোর অবদানকে হ্রাস করে দেখেছেন। এই মন্তব্যের ফলে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি সরকারী দপ্তর থেকে তীব্র নিন্দা প্রকাশ পায়।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমা ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অপমানজনক ও ন্যাক্কারজনক’ বলে অভিহিত করে, প্রেসিডেন্টকে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে, ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স হ্যারিরও ট্রাম্পের ন্যাটো‑সংক্রান্ত সমালোচনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা প্রকাশ পায়। উভয় নেতার মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাজ্যের সামরিক অবদানের প্রতি রক্ষার ইচ্ছা স্পষ্ট।
ট্রাম্পের পরবর্তী পোস্টে তিনি ব্রিটিশ সৈন্যদের সাহসিকতা ও ত্যাগকে উঁচু করে তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সর্বদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে এবং আফগানিস্তান যুদ্ধের শিকারদের মধ্যে সর্বকালের সেরা যোদ্ধারা অন্তর্ভুক্ত। পোস্টে তিনি যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর হৃদয় ও প্রাণশক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্য কোনো দেশের তুলনায় কম নয়’ বলে প্রশংসা করেন।
ট্রাম্পের এই উল্টো সুরের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র‑যুক্তরাজ্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ২০০১ সালের ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ কার্যকর করে, যার ফলে ন্যাটো‑সদস্য দেশগুলো আফগানিস্তান অভিযানে অংশ নেয়। সেই সময়ে যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার ফলে ৪৫৭ জন সৈনিকের মৃত্যু ও বহু আহতের দুঃখজনক পরিসংখ্যান রেকর্ড হয়।
ট্রাম্পের ন্যাটো‑সংক্রান্ত সমালোচনা কেবল যুক্তরাজ্যই নয়, ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকেও বিরক্ত করে। মেলোনি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করে, ন্যাটোর ঐতিহাসিক সংহতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনকে প্রশংসা করেন। তিনি যুক্তি দেন, ন্যাটো‑সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বজায় রাখে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের ন্যাটো‑বিরোধী রেটরিক এবং একই সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যদের প্রশংসা, দুইটি ভিন্ন দিকের বার্তা একসাথে পাঠায়, যা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষত, যুক্তরাজ্যের সরকারী দপ্তরগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র‑যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী রেটরিক তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য হতে পারে, যেখানে তিনি মিত্র দেশগুলোর প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে নিজের ভিত্তি জোরদার করতে চান। তবে, একই সঙ্গে তিনি ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের প্রশংসা করে, দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক বন্ধন বজায় রাখার সংকেতও দেন।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ত্যাগের স্বীকৃতি ও ন্যাটো‑সংক্রান্ত সমালোচনা একসাথে প্রকাশের ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো ট্রাম্পের নীতি-দিকনির্দেশনা সম্পর্কে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যতে, ন্যাটো‑সদস্য দেশগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রভাব বিবেচনা করে, সামরিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ন্যাটো‑সংক্রান্ত সমালোচনা এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের প্রশংসা একসাথে মিশে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। মিত্র দেশগুলো এই দ্বিমুখী রেটরিকের প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়ে, ন্যাটো‑সংগঠনের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অবদানের গুরুত্ব পুনরায় জোরদার করেছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র‑মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের পুনঃমূল্যায়নের দরজা খুলে দিতে পারে।



