বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও কাঠামোগত ঘাটতি, রোগের বোঝা বাড়া এবং সামাজিক বৈষম্য মিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ঢাকার জনসংখ্যা ২০২৫ সালের জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রায় ৩৬.৬ মিলিয়ন বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে বৃহৎ সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা স্বাধীনতা পর থেকে তেমন বাড়েনি। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে, নতুন কোনো বড় হাসপাতালের যোগদান সীমিত।
বেসরকারি ক্লিনিকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে সেগুলি অধিকাংশই নিম্নআয়ের জনগণের জন্য ব্যয়বহুল। নগর এলাকায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা মানুষদের জন্য সরকারী হাসপাতালই প্রায়শই একমাত্র সেবা প্রদানকারী। তাই শহরের বাসিন্দাদের জন্য হাসপাতাল ভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য।
বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো যদি শুধুমাত্র ঢাকেই কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে নোয়াখালি, কুড়িগ্রাম ইত্যাদি জেলা থেকে রোগীরা দীর্ঘ দূরত্ব, সময় এবং আর্থিক ব্যয় বহন করে বড় শহরে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়। এই পরিস্থিতি টেকসই নয় এবং রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
ডাক্তারি কলেজ ও তাদের হাসপাতালগুলোকে ঢাকা ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলেও সজ্জিত ও পর্যাপ্ত কর্মী দিয়ে সজ্জিত করা দরকার। এভাবে রোগীরা তাদের নিজ এলাকার কাছাকাছি মানসম্মত সেবা পাবে, যাত্রা ও খরচ কমবে।
গ্রামাঞ্চলের জনসংখ্যা শহরের তুলনায় বেশি, তাই গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও সমানভাবে জরুরি। দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার এবং কমিউনিটি ক্লিনিক অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষকে সেবা দেয় এবং সেখানে একজন কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার কাজ করেন।
তবে এই নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা সীমিত থাকায় রোগীর প্রাথমিক সেবা থেকে উচ্চতর স্তরে রেফারেল প্রক্রিয়ায় দেরি হয়। গ্রামীণ এলাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাব রোগীর পুনরুদ্ধার সময় বাড়িয়ে দেয় এবং কখনো কখনো জরুরি অবস্থায় গৃহস্থালির আর্থিক বোঝা বাড়ায়।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শহর ও গ্রাম উভয়ই সমন্বিত হাসপাতাল নেটওয়ার্কের অভাবে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও প্রবেশযোগ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। সরকারী পরিকল্পনায় নতুন হাসপাতালের নির্মাণ, বিদ্যমান সুবিধার আধুনিকীকরণ এবং কর্মী প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বেসরকারি সেক্টরের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা যেন নিম্নআয়ের জনগণের জন্য সাশ্রয়ী হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে সেবা মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
অবশেষে, স্বাস্থ্যসেবার সমতা অর্জনের জন্য নীতি নির্ধারকদের উচিত দীর্ঘমেয়াদী বাজেট বরাদ্দ, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এভাবে রোগের বোঝা কমে এবং জনগণের সামগ্রিক সুস্থতা বৃদ্ধি পাবে।
সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত ঘাটতি দূর করা কঠিন। তাই এখনই সময় এসেছে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার এবং সকলের জন্য সুলভ, মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার।



