বাংলাদেশে শাসন কাঠামোর অস্থিতিশীলতা সরাসরি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রভাবিত করছে। সরকারী সেবা দু’টি ক্ষেত্রেই দুর্বলতা স্পষ্ট, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা কেবল সেবা ব্যাহত নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলছে। যথাযথ শিক্ষা না পেলে তরুণরা কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নে পিছিয়ে পড়বে, যা জাতির দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিক্ষা সংকটের আলোচনা বহু বছর ধরে চলছে। ঐতিহাসিকভাবে উপমহাদেশের প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতি—গুরুকুল, মঠ, মক্তব ও মাদ্রাসা—কে রোমান্টিক দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে সেগুলো মূলত সীমিত অভিজাত গোষ্ঠীর জন্যই ছিল। ধর্মীয় বিষয়বস্তুতে জোর দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
১৮শ শতাব্দীতে পশ্চিমা উপনিবেশিক শাসন আধুনিক শিক্ষার সূচনা করে, তবে তা মূলত উপনিবেশিক প্রশাসনের সেবা করার জন্য সীমিত পরিসরে চালু হয়। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানের আধা-উপনিবেশিক শাসনেও একই কাঠামো বজায় থাকে, ফলে শিক্ষার সুযোগ ও লক্ষ্য সীমাবদ্ধ থাকে।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলোতে ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদা নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশন নতুন জাতির জন্য উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের দায়িত্ব পায় এবং ১৯৭৪ সালে তার প্রতিবেদন সরকারে উপস্থাপন করে।
কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং তার পরের রাজনৈতিক পরিবর্তন এই প্রতিবেদনকে অপ্রচলিত করে দেয়। ফলে খুদা কমিশনের সুপারিশগুলো সংরক্ষণাগারে আটকে যায় এবং বাস্তবায়িত হয় না।
এরপর থেকে প্রতিটি সামরিক ও নির্বাচিত সরকার নিজস্ব শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কাজী, হোসেন, মেহের, রেজা ইত্যাদি নামের কমিশনগুলো ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে, তবে কোনোটি দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়নি।
কমিশনগুলোর সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবিক বাস্তবায়ন ও তদারকি দুর্বল থাকায় শিক্ষার গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং পাঠ্যক্রমের পুরোনোত্ব এখনও প্রধান সমস্যারূপে রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনগুলোতে প্রায়ই আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা ভিত্তিক পাঠ্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বাজেটের ঘাটতি ও নীতি বাস্তবায়নের অক্ষমতা এই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করলে পিছিয়ে থাকে।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই অবনতির ফলে দেশের মানবসম্পদ বিকাশে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সমৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর। সরকার যদি দ্রুত কার্যকরী সংস্কার না করে, তবে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সংকট ও দারিদ্র্যের হার বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য পিতামাতা ও শিক্ষকমণ্ডলীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, এবং সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা সংস্কারের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যালয়ের মৌলিক অবকাঠামো মেরামত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োগ করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করলে শিক্ষার মানে ত্বরিত উন্নতি সম্ভব।
আপনার এলাকার স্কুলে কী ধরনের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন? আপনার মতামত ও প্রস্তাবনা শেয়ার করে শিক্ষার উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারেন।



