২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১২ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স, যার নেতৃত্বে ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুসের সহকর্মী ড. কে.এ.এস. মুরশিদ ছিলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি বিশদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার জন্য ত্বরিত সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার সময় বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ঘাটতি, দশ শতাংশের উপরে মুদ্রাস্ফীতি, নন‑পারফরমিং ঋণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকিং সেক্টর এবং সামাজিক অশান্তি সহ একাধিক চাপের মুখে ছিল। এই পরিস্থিতি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
সঙ্কটের মাঝেই একটি সুযোগের ইঙ্গিত দেখা যায়; অতীতের নীতিগত ত্রুটি পুনর্মূল্যায়ন এবং দশকের পর দশক ধরে স্থগিত থাকা সংস্কারগুলোকে ত্বরান্বিত করার সময় এসেছে। টাস্কফোর্সের মতে, এই সংস্কারগুলো না হলে আর্থিক সমতা ও সমৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন ৫৫০ পৃষ্ঠার বিশাল ডকুমেন্ট, যা শুধু সমস্যার বিশ্লেষণ নয়, ত্বরিত ফলাফল আনার সম্ভাব্য পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা প্রদান করে। এতে দ্রুত ফলপ্রসূ উদ্যোগ এবং গভীর সংস্কার উভয়েরই গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ম্যাক্রোইকোনমিক স্থিতিশীলতা নির্ধারিত হয়েছে। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে মুদ্রা, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন বলে টাস্কফোর্স জোর দিয়েছে।
গ্লোবাল শক—কোভিড‑১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পণ্যদ্রব্যের তীব্র বৃদ্ধি—বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে, তবে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দ্বৈত চাপের ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতি পেয়েছে।
খাদ্যদ্রব্যের মুদ্রাস্ফীতি জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রায় দশ শতাংশ থেকে বর্তমান সময়ে সাত শতাংশে নেমে এসেছে, তবে অখাদ্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এখনও প্রায় নয় শতাংশে স্থির রয়েছে। এই পার্থক্য নীতি নির্ধারণে সূক্ষ্ম সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
টাকার মান ২০২২ থেকে ডলারের তুলনায় ৩৫‑৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা রপ্তানি ও আমদানি উভয়েরই ব্যয়বহুল করে তুলেছে। একই সঙ্গে, দেশের ট্যাক্স‑টু‑GDP অনুপাত মাত্র ৮.৬৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।
বৃহৎ বাজেট ঘাটতি এবং ঋণ বাড়ার ফলে প্রায় অর্ধেক ট্যাক্স আয় সুদের পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এই উচ্চ সুদভিত্তিক ব্যয় আর্থিক স্বনির্ভরতা হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
টাস্কফোর্সের সুপারিশে ট্যাক্স সংগ্রহের দক্ষতা বাড়ানো, করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং অব্যবহৃত রেভিনিউ পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি, বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয়িক শৃঙ্খলা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্যাংকিং সেক্টরের অপ্রদত্ত ঋণ সমস্যার সমাধানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ পুনর্গঠন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে। এধরনের পদক্ষেপগুলো আর্থিক বাজারের স্বচ্ছতা বাড়িয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে।
উদ্যোক্তা শক্তি ও সৃজনশীলতা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে, টাস্কফোর্স নতুন ব্যবসা ও স্টার্ট‑আপের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তি প্রবেশ এবং দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই নীতি সামাজিক সমতা ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সমন্বয় ঘটাবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, যদি সুপারিশকৃত সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা প্রত্যাশিত। তবে সংস্কার বিলম্বিত হলে মুদ্রা অবমূল্যায়ন, ঋণ সেবা খরচ বৃদ্ধি এবং আর্থিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অস্থায়ী সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট কর্মপথ উপস্থাপন করে; তাৎক্ষণিক ম্যাক্রোইকোনমিক সমন্বয়, ট্যাক্স রেভিনিউ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং সেক্টরের পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এই পদক্ষেপগুলোই দেশের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।



