ইলেকশন কমিশন (ইসি) আজ নির্বাচনী জনসভায় রাত আটটার পরে মাইক্রোফোন ও লাউডস্পিকার চালু করা নিষিদ্ধের নির্দেশ জারি করেছে। এই পদক্ষেপটি নির্বাচনী আচরণবিধি ২০২৫‑এর নতুন বিধান অনুসারে নেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রচারণার শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত।
বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, তাদের মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী অথবা তাদের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তি নির্বাচনী এলাকায় দুপুর দুইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মাইক্রোফোন বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন। এই সময়সীমার বাইরে যেকোনো ব্যবহারকে সরাসরি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।
প্রতিটি সমাবেশে সর্বোচ্চ তিনটি লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে এবং শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেল অতিক্রম করা যাবে না। এই সীমা নির্ধারণের মূল উদ্দেশ্য হল প্রতিবেশী এলাকার শান্তি বজায় রাখা এবং ভোটারদের উপর অতিরিক্ত শব্দের প্রভাব কমানো।
তবে সাধারণ প্রচারণায় ব্যবহৃত হ্যান্ডহেল্ড মাইক্রোফোনের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়; সেগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়নি। ফলে দলগুলো বিকল্পভাবে ছোট মাইক্রোফোন ব্যবহার করে তাদের বার্তা পৌঁছাতে পারবে, তবে লাউডস্পিকার‑ভিত্তিক উচ্চশব্দের ব্যবহার এখন কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ।
নতুন আচরণবিধি মেনে চলার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পৃথক অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করতে হবে। অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো প্রার্থী বা তার সহযোগী লঙ্ঘন করে, তবে সংশ্লিষ্ট দলকেও শাস্তির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে প্রার্থীর স্বাক্ষরিত নথিতে তিনি ও তার দুইজন সাক্ষী আইন অনুযায়ী শাস্তি মেনে নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিধি অনুসারে, কোনো প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট দলকে আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হবে। জরিমানার পরিমাণ ও প্রক্রিয়া নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্ধারিত, যা দলের আর্থিক দায়িত্বকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। ফলে দলগুলোকে তাদের ক্যাম্পেইন পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে, বিশেষত সন্ধ্যা‑রাতের সমাবেশে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি মন্তব্য করেন, “রাত ৮টার পর জনসভায় মাইক ব্যবহার করা স্পষ্ট আইনভঙ্গ। এটি নির্বাচন কমিশনের আইনে উল্লেখ রয়েছে। আচরণবিধি ভঙ্গ হলে কী করা হবে, সেটিও সেখানে বলা আছে। যেহেতু নির্বাচন কমিশন আইন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ, তাই বিষয়টি তারা দেখবে।”
রাজনৈতিক দলগুলো এখন এই নতুন বিধান মেনে চলার জন্য অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা তৈরি করছে এবং তাদের ক্যাম্পেইন টিমকে রাতের সমাবেশে শব্দ ব্যবহারের সীমা সম্পর্কে সচেতন করছে। দলগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে কিছু সমাবেশে লাউডস্পিকার সংখ্যা কমিয়ে তিনটি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রাতের সময়ে ভিড়ের আকর্ষণ বাড়াতে দলগুলো প্রায়শই উচ্চশব্দের ব্যবহার করে, তাই এই বিধি তাদের প্রচারণা কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় যেখানে সন্ধ্যা‑রাতের সমাবেশ বেশি জনপ্রিয়, সেখানে দলগুলোকে বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন ছোট মাইক্রোফোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ইসির এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত করা, পাশাপাশি ভোটারদের ওপর অপ্রয়োজনীয় শব্দের প্রভাব কমানো। ভবিষ্যতে যদি কোনো লঙ্ঘন ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট দল ও প্রার্থীর ওপর আর্থিক শাস্তি আরোপের মাধ্যমে নিয়মের প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। এভাবে নির্বাচনী পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত রাখতে ইসির ভূমিকা আরও দৃঢ় হবে।



