একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, দৈনন্দিন চলাচলে সামান্য বাড়তি সময়ও মানুষের আয়ু বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র ব্যায়াম নয়, বরং প্রতিদিনের রুটিনে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত হাঁটা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণাটি ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সম্পন্ন হয় এবং এতে বিভিন্ন বয়স ও শারীরিক অবস্থার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের দৈনিক শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণ রেকর্ড করা হয় এবং তাদের স্বাস্থ্য ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিট অতিরিক্ত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ফলাফলগুলো কোনো মারাথন দৌড় বা জিমে ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যায়াম করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে না। গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, অধিকাংশ মানুষ সহজে বাস্তবায়ন করতে পারে এমন ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, বাড়িতে ছোট হাঁটা, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, অথবা বাজারে যাওয়ার পথে একটু বেশি দূরত্বে হাঁটা—এগুলোই যথেষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে কম সক্রিয়, তাদের জন্য এই ছোট পরিবর্তনগুলো বেশি উপকারি বলে গবেষণায় দেখা গেছে। যারা কাজের চাপ, ক্লান্তি বা স্বভাবগতভাবে ব্যায়ামকে অগ্রাধিকার দেন না, তাদের দৈনন্দিন রুটিনে মাত্র কয়েক মিনিটের অতিরিক্ত গতি যোগ করলেই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা বা স্থির অবস্থায় থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দিনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। সুতরাং, বসে থাকা সময় কমিয়ে নিয়মিত দাঁড়িয়ে থাকা বা হালকা চলাচল করা গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনন্দিন জীবনে বসে থাকা সময় কমাতে সহজ কিছু উপায় রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টেলিভিশন বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে প্রতি ৩০ মিনিটে একবার দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটা, গৃহকাজের সময় ছোট ছোট বিরতি নেওয়া, অথবা কাজের মাঝখানে টয়লেটের বদলে একবার লম্বা হাঁটা—এগুলোই কার্যকর পদ্ধতি।
এই গবেষণার ফলাফল পূর্বের শারীরিক কার্যকলাপের নির্দেশিকা থেকে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে। আগে সাধারণত সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের মাঝারি ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হতো, তবে এখন দেখা যাচ্ছে যে, ছোট ছোট দৈনন্দিন পদক্ষেপগুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে বাস্তবিকভাবে অর্জনযোগ্য ছোট পরিবর্তনগুলোকে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা বেশি কার্যকর। তাই, প্রতিদিনের রুটিনে পাঁচ মিনিটের অতিরিক্ত হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের গুণগত মান বাড়াতে পারে।
এই ফলাফলগুলো জনস্বাস্থ্যের নীতি নির্ধারণে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করতে পারে। সরকারী স্বাস্থ্য প্রোগ্রামগুলো যদি ছোট, সহজলভ্য পদক্ষেপকে উৎসাহিত করে, তবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং রোগের বোঝা কমে আসতে পারে।
তবে, এই তথ্যগুলো কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প নয়; এটি কেবলমাত্র সাধারণ শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পাঠকদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ হল, আজই নিজের দৈনন্দিন রুটিনে পাঁচ মিনিটের অতিরিক্ত হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকা যুক্ত করার চেষ্টা করা। ছোট পরিবর্তনগুলোকে ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখলে সময়ের সাথে সাথে স্বাস্থ্যের উন্নতি অনুভব করা সম্ভব।
আপনি কি আপনার দৈনন্দিন জীবনে এমন কোনো ছোট পরিবর্তন যোগ করতে প্রস্তুত, যা দীর্ঘমেয়াদে আপনার স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?



