ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজে এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ন্যাটো দেশগুলো সামনের লাইন থেকে দূরে নিরাপদ অবস্থানে থেকে কাজ করেছে। এই মন্তব্যের ফলে ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো থেকে তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা জানানো হয়। ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইতিহাস বিকৃতি ও মিত্রদের প্রতি অবমাননা হিসেবে গণ্য করা হয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন, ন্যাটো দেশগুলো আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছে, তবে তারা সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নেয়নি। তিনি যুক্তি দেন, ন্যাটো সেনারা “নিরাপদ দূরত্বে” অবস্থান করে কাজ করেছিল, ফলে তাদের সাহসিকতা ও ত্যাগের মাত্রা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই রকম মন্তব্য আফগান যুদ্ধের সময় বহু দেশের সৈন্যের ত্যাগকে উপেক্ষা করার মতো শোনায়, যা ন্যাটো জোটের ঐক্যকে ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি তৈরি করে।
ন্যাটো সদস্য ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতারা ট্রাম্পের মন্তব্যকে কঠোরভাবে নিন্দা করেন। তারা জোর দিয়ে বলেন, আফগানিস্তানে ন্যাটো দেশগুলোর সৈন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে এবং উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ভোগ করেছে। তাদের মতে, ট্রাম্পের এই রকম মন্তব্য ন্যাটোর পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ইতিহাসের সত্যকে বিকৃত করে। তাই, তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে দাবি করা হয়।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের মন্তব্যের উপর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি উল্লেখ করেন, আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের ৪৫৭ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অনেকেই শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েছেন। স্টারমার বলেন, ট্রাম্পের এই রকম বক্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, বরং শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত কষ্টের কারণ। তিনি যুক্তি দেন, যদি কোনো নেতা ভুল তথ্য প্রদান করেন, তবে তা স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া ন্যায়সঙ্গত।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স ট্রাম্পের অবস্থান রক্ষা করেন এবং যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবদান ন্যাটো জোটের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। রজার্সের মতে, ন্যাটো জোটের সব দেশ সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সর্বাধিক ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃতিত্বকে তুলে ধরা একটি যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি। এই বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে তীব্র পার্থক্য সৃষ্টি করে।
যুক্তরাজ্যের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে মোট ১,৫০,০০০ের বেশি ব্রিটিশ সৈন্য দায়িত্ব পালন করেছে। এ সময়কালে ৪৫৭ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছেন, আর শত শত সৈন্য শারীরিক ও মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরোধিতা করে, কারণ এটি স্পষ্ট করে যে ব্রিটিশ সেনারা সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন এবং বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের ফলে ন্যাটো জোটের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে ন্যাটো-ইউরোপীয় সহযোগিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যকে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক নোট পাঠাতে পারে এবং ভবিষ্যতে সমন্বিত নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে এই বিষয়টি আলোচনার সূচিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের মন্তব্যের সংশোধন ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি পুনরায় উত্থাপন করতে পারেন। হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের পদ্ধতি এই বিতর্কের মূল চালিকাশক্তি হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত, আফগানিস্তান যুদ্ধের স্মৃতি ও ত্যাগের স্বীকৃতি ন্যাটো জোটের ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি হিসেবে রয়ে যাবে।



