দিল্লিতে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলা ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের মহোৎসবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ নেতা, ইউরোসফটের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেয়েন এবং ইউরোপরীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্টা, প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন। এই অনুষ্ঠানটি দেশের সংবিধান গ্রহণের ৭৭তম বার্ষিকী চিহ্নিত করে এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে বিশাল প্যারেডের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
দিল্লির কার্তব্য পথ, যা পূর্বে রাজপথ নামে পরিচিত ছিল, এই দিনটি রঙিন পটভূমি, সজ্জিত ত্রয়ী এবং সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় রোডশোয় দিয়ে সজ্জিত হয়। সশস্ত্র ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি গাড়ি এবং আধুনিক যুদ্ধবিমান আকাশে গর্জন করে, যখন হাজারো নাগরিক রাস্তার ধারে গর্বের সঙ্গে তালি দেয়।
প্যারেডে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন শাখা সমন্বিত হয়ে সমন্বিত রোডশো প্রদর্শন করে, যার মধ্যে হেভি ট্যাঙ্ক, রকেট লঞ্চার এবং এয়ারফোর্সের সুপারসোনিক জেট অন্তর্ভুক্ত। এই দৃশ্যপট দেশের সামরিক সক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
দিল্লির রাস্তায় উপস্থিত বিশাল জনসমাগমের পাশাপাশি, দেশের প্রতিটি কোণায় টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি অনুসরণ করে। প্যারেডের রঙিন ফ্লোট এবং সাংস্কৃতিক ট্যাবলিও দেশীয় ঐতিহ্যকে বিশ্ব মঞ্চে উপস্থাপন করে।
প্রধানমন্ত্রী নয়, রাষ্ট্রপতি এই প্যারেডের সর্বোচ্চ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকেন এবং প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতির পাশে বসে। এই বসার ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে দেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষ করে, প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতির নিকটবর্তী আসনে বসে, যা অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় বেশি মর্যাদা পায়। এই প্রথা দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে কাজ করে।
প্রজাতন্ত্র দিবসের এই রীতি ১৯৫০ সালে শুরু হয়, যখন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকার্নো প্রথমবারের মতো এই প্যারেডে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময়ে ভারত স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন স্বাধীন দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী ছিল।
প্রারম্ভিক দশকগুলোতে প্রধান অতিথি হিসেবে বেশিরভাগই নতুন স্বাধীন দেশগুলোর নেতা ছিলেন, যা ভারতের অ-সামরিক, অ-গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়কে প্রতিফলিত করত। এই নীতি দেশের বহুপাক্ষিক নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বছরের পর বছর, প্যারেডে উপস্থিত অতিথির তালিকা পরিবর্তিত হয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা ভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন থেকে প্রধান অতিথি আসা দেখা গেছে।
এই বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ নেতাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে। এটি ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্পের প্রসারকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতির পাশে ইউই নেতাদের বসানো কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার নয়, বরং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনার সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করবে। এই অবস্থানটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক ইঙ্গিত করেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই উচ্চ পর্যায়ের উপস্থিতি ভারতের চীনের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে, কারণ দু’দেশই এশিয়ায় কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। তবে সরকারী সূত্রে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রজাতন্ত্র দিবসের পরবর্তী দিনগুলোতে ভারত-ইউই সম্পর্কের নতুন চুক্তি স্বাক্ষর, বিনিয়োগ ফোরাম এবং প্রযুক্তি মেলায় আলোচনা চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধরনের ইভেন্টগুলোকে দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়।
সারসংক্ষেপে, ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড কেবল ঐতিহাসিক স্মরণীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ভারতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি এই দিকের স্পষ্ট সংকেত প্রদান করে।



