ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং পঞ্চগড়-ঢাকা রেলপথে চলমান ট্রেন যাত্রীরা সাম্প্রতিক সময়ে ‘অজ্ঞান পার্টি’ ও ‘মলম পার্টি’ নামে পরিচিত গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হয়ে আসছে। এই গোষ্ঠি ট্রেন স্টেশনে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পর, চকলেট, শারবত, আচার, ডাব ইত্যাদি খাবার দিয়ে তাদের অচেতন করে, এরপর সম্পূর্ণ সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগীরা তাদের সমস্ত নগদ, মোবাইল, পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী হারিয়ে ফেলেছে।
গোষ্ঠির সদস্যরা সাধারণত স্টেশন প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হয়ে, যাত্রীদের সঙ্গে আলাপ শুরু করে এবং খাবার ভাগ করে দেয়। প্রথমে তারা বিনয়ী ও সহায়ক আচরণ প্রদর্শন করে, ফলে যাত্রীরা তাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। খাবার গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যে বেশিরভাগ ভুক্তভোগী অচেতন অবস্থায় পড়ে এবং যখন তারা জাগে, তখন তাদের সম্পদ নিখোঁজ থাকে। এই পদ্ধতি বহুবার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে, ফলে ট্রেন যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশের মতে, এই অপরাধের পেছনে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা রেলপথের ব্যস্ততম রুটগুলোতে সক্রিয়। তদন্তে জানা যায়, গোষ্ঠির সদস্যরা প্রায়ই একই রকম পোশাক ও আচরণে একে অপরকে চিহ্নিত করে, ফলে তাদের সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগ এবং স্থানীয় পুলিশ একসঙ্গে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করার জন্য বিশেষ অপারেশন চালু করেছে।
অধিকাংশ ভুক্তভোগী রিপোর্ট করেছেন যে, তারা প্রথমে গোষ্ঠির সদস্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথন এবং খাবার ভাগাভাগি করে স্বস্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু অচেতন হওয়ার পর সম্পূর্ণ সম্পদ হারিয়ে গিয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীরা তাদের মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা কথোপকথন ও ছবি দিয়ে গোষ্ঠির পরিচয় প্রকাশের চেষ্টা করেছে, তবে এখনও পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট আইডেন্টিটি প্রকাশ পায়নি।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানিয়েছে, গোষ্ঠির কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগ রেললাইন ও স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি, যাত্রীদের সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে, অচেনা ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার গ্রহণ না করা, অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত আলাপ না করা এবং কোনো অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মীদের জানাতে বলা হচ্ছে।
অপরাধের প্রভাব শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়; ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ট্রেন ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে পারেন। এই পরিস্থিতি রেল পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষয় করে, যা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পুলিশের বর্তমান তদন্তে, গোষ্ঠির সদস্যদের সনাক্ত করতে ডিএনএ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং সিসিটিভি ফুটেজের ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে স্টেশনগুলোতে ক্যামেরা সংখ্যা বাড়ানো এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে, সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আদালতে আনা হবে এবং প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য, সরকার ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো একত্রে কর্মসূচি চালু করেছে। রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে পোস্টার, প্যানেল এবং অডিও বিজ্ঞাপন দিয়ে যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে তারা অচেনা ব্যক্তির কাছ থেকে খাবার গ্রহণে সতর্ক থাকে। এছাড়া, ট্রেন স্টাফদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্দেহজনক আচরণ দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি, যাত্রীদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য, যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা, অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত যোগাযোগ এড়িয়ে চলা এবং কোনো সন্দেহজনক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত নিরাপত্তা কর্মীকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগ ও পুলিশ একত্রে কাজ করে, এই গোষ্ঠীর কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করছে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলার শুনানি হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। জনসাধারণকে অনুরোধ করা হচ্ছে, কোনো সন্দেহজনক ঘটনা লক্ষ্য করলে সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯৯ নম্বরে ফোন করে তথ্য প্রদান করতে।



