বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে দেশের ব্যাংক খাতে আমানত প্রায় ২৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বার্ষিক দুই অঙ্কের বৃদ্ধির সূচক দেখায়। এই বৃদ্ধি ব্যাংক সিস্টেমের তরলতা ও ঋণদানের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, নভেম্বরের শেষের দিকে মোট আমানত ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা অক্টোবরের সমাপ্তিতে রেকর্ড করা ১৯ লাখ ২৪ হাজার ১২১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ২৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে এই পার্থক্য উল্লেখযোগ্য এবং বাজারে ইতিবাচক প্রবাহের ইঙ্গিত দেয়।
বছরের তুলনায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আমানতের পরিমাণ ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, ফলে এক বছরের ব্যবধানে মোট বৃদ্ধি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। শতাংশে এই বৃদ্ধি ১০.৮০% হিসেবে রেকর্ড হয়েছে, যা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধারের দৃঢ় চিত্র তুলে ধরে।
নগদ অর্থের প্রবাহেও পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। জুনের শেষের দিকে ব্যাংকের বাইরে নগদের পরিমাণ ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ছিল, যা নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত কমে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। পাঁচ মাসের মধ্যে নগদ অর্থের এই হ্রাস ব্যাংকিং সিস্টেমে আস্থার পুনরুদ্ধারকে নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকরা কয়েকটি মূল কারণকে আমানত বৃদ্ধির পেছনে উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসায় মানুষ অতিরিক্ত নগদ ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলকভাবে উচ্চ সুদের হার আমানত আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে গ্রাহকরা নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা রাখতে উৎসাহিত হয়েছে। তৃতীয়ত, শক্ত ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক সূচক উন্নত হওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা পুনরায় ফিরে এসেছে। এছাড়া, প্রবাসী আয়ের প্রবাহও আমানত বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
পূর্বের বছরগুলোতে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু ব্যাংকের প্রতি আস্থার অভাব তীব্রতর হয়ে উঠেছিল, ফলে নগদ তোলার প্রবণতা বেড়েছিল। তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি এবং সংস্কারমূলক নীতিমালার বাস্তবায়ন আস্থার সংকটকে ধীরে ধীরে কমিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি পরিবর্তন, বিশেষ করে সুদের হার সমন্বয় এবং তহবিলের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো গ্রাহকদের ব্যাংকে টাকা রাখার প্রেরণা বাড়িয়েছে। এই নীতি পরিবর্তনগুলো ঋণদানের শর্তকে সহজ করে এবং ব্যাংকের লিকুইডিটি অবস্থাকে শক্তিশালী করে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সুদের হার আকর্ষণীয় মাত্রায় বজায় থাকে, তবে আমানত প্রবাহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, কোনো ধরণের আর্থিক শক বা আস্থার পুনরায় ক্ষয় হলে নগদ তোলার প্রবণতা পুনরায় বাড়তে পারে, যা ব্যাংক সিস্টেমের তরলতা ও ঋণদানের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে। তাই, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সতর্ক নজরদারি এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপে, নভেম্বর মাসে ব্যাংক আমানতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং নগদ অর্থের হ্রাস বাংলাদেশের আর্থিক সেক্টরের পুনরুজ্জীবনের সূচক হিসেবে দেখা যায়। এই প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকলে ব্যাংকগুলোর ঋণদানের ক্ষমতা বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে।



