বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে শনিবার সকালে ডাইনিং এলাকায় নয়জন উচ্চপদস্থ ভারতীয় কর্মকর্তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা হয়। রামপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানিয়ে দেয়। এই ঘটনার ফলে প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত দিক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের সন্ধান শুরু করার পর জানা যায়, তারা অনুমতি ছাড়াই চুপিসারে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে ফিরে গেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হলেন এনটিপিসি (ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন) থেকে রামপাল কেন্দ্রে নিযুক্ত জিএম সিউজ প্রতীক বর্মন, বিশ্বজিৎ মন্ডল, এন সূর্যপ্রকাশ রায়, এজিএম কেসাবা পলাকী, পাপ্পু লাল মিনা, ডিজিএম সূর্যকান্ত মন্দেকার, সুরেন্দ্র লম্বা, অর্নিবাণ সাহা এবং সিএফও ইমানুয়েল পনরাজ দেবরাজ।
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপমহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজিম জানান, ডাইনিং টেবিলে তাদের না পেয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায় যে তারা কোনো নথি বা অনুমোদন ছাড়াই চলে গেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং প্রস্থানকারীদের উদ্দেশ্য ও পেছনের কারণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, নয়জন কর্মকর্তা সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সরাসরি ভারতে রওনা হন। রামনাথ পুজারী, যিনি প্রকল্পের পরিচালক, পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগে জানিয়ে দেন যে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগের কারণে তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও এই অভিযোগের সঠিক ভিত্তি এখনও স্পষ্ট হয়নি।
রামপাল কেন্দ্রে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং আনসারসহ চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। তবুও কর্মকর্তারা নিরাপত্তা হুমকির উল্লেখ করে প্রস্থান করেছেন, যা নিরাপত্তা প্রোটোকল ও তত্ত্বাবধানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পূর্বে না থাকায় এই পদক্ষেপকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, রামপাল প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ভারত জ্বালানি সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হঠাৎ প্রস্থান প্রকল্পের সময়সূচি ও খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত, এনটিপিসি থেকে আসা এই কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় মূল ভূমিকা পালন করছিলেন; তাদের অনুপস্থিতি প্রকল্পের অগ্রগতিতে বিলম্বের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
বাজারে ইতিমধ্যে এই ঘটনার ফলে জ্বালানি সেক্টরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। বিদেশি ও স্থানীয় বিনিয়োগের ওপর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন শর্তকে কঠিন করতে পারে। এছাড়া, বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলায় রামপাল কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা পূরণে বিলম্ব হলে দেশের জ্বালানি ঘাটতি বাড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের জ্বালানি সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। রামপাল কেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিচালনা দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ; কর্মকর্তাদের অপ্রত্যাশিত প্রস্থান এই বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ভবিষ্যতে সমন্বিত নিরাপত্তা প্রোটোকল ও স্পষ্ট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হয়েছে।
অধিকন্তু, রামপাল প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরবরাহকারী ও কন্ট্রাক্টরদেরও সরাসরি প্রভাব পড়বে। প্রকল্পের সময়সূচি পরিবর্তিত হলে শ্রমিকের কাজের সময় ও বেতন, কাঁচামালের সরবরাহ চেইন এবং লজিস্টিক্সে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হতে পারে। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ ব্যবহারকারীর বিদ্যুৎ মূল্যে প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে নয়জন ভারতীয় কর্মকর্তার অপ্রত্যাশিত প্রস্থান নিরাপত্তা, পরিচালনাগত ও আর্থিক দিক থেকে একাধিক চ্যালেঞ্জ উন্মোচন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদানই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার মূল চাবিকাঠি। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তা প্রোটোকল শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই ঘটনাটি জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ, প্রকল্পের সময়সূচি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং স্বচ্ছ যোগাযোগই রামপাল প্রকল্পকে পুনরায় সঠিক পথে চালিয়ে যাওয়ার মূল ভিত্তি হবে।



