কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারের পদে কাজ করা মাসুমা আনোয়ার, চট্টগ্রাম নেভি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ২০১১ সালের শেষের দিকে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে চিকিৎসকরা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে তিনি কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করে এখন দুই সন্তানকে একা লালন-পালন করছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত আছেন।
মাসুমা ১৬ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং একই সঙ্গে তার শিক্ষাগত যাত্রা থামেন না। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি চিকিৎসা পেশা চালিয়ে যান। ২০০৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি স্বামী হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যান; পরিবার তাকে মৃত বলে ধারণা করে, যদিও পরবর্তীতে জানা যায় তিনি জীবিত ছিলেন। স্বামীর অপ্রত্যাশিত প্রস্থান এবং শ্বশুরবাড়ির শারীরিক নির্যাতন তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
মানসিক চাপের ফলে ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরতা গড়ে ওঠে এবং ঘুমের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যায় পরিণত হয়। এক সময় এমনকি ওষুধ সেবনের পরও তিনি কয়েক দিন ঘুমাতে পারেননি, ফলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কৃত্রিম অক্সিজেনের সহায়তা নিতে বাধ্য হন। ২০১১ সালে তার শারীরিক অবস্থা এতটাই অবনতি ঘটায় যে চিকিৎসকরা আর বেঁচে থাকার আশায় বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবু তিনি নিজের ইচ্ছাশক্তি ও পরিবারের সমর্থনে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের উন্নতি করেন।
আজ মাসুমা দুই সন্তান—মেয়ে ফাতিহা এবং ছেলে আলিফ—কে একা বড় করছেন। ফাতিহা চট্টগ্রামের ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টার পড়ছেন, পাশাপাশি অনলাইন ব্যবসা, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন এবং নৃত্য শিক্ষাদানের কাজেও যুক্ত। আলিফ বর্তমানে পোল্যান্ডে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছেন। সন্তানদের শিক্ষার পাশাপাশি মাসুমা নিজেও বাড়ি ভাড়া দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছেন, যা তার কঠোর পরিশ্রমের ফল।
মাসুমা অতীতের কষ্টের কথা স্বীকার করে বলেন, “শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, গলা টিপে ধরার মতো শারীরিক আঘাত, সবই আমার জীবনের অম্লান দাগ। তবে সেসব স্মৃতি আর আমাকে ভয় দেখায় না।” তিনি উল্লেখ করেন যে, জীবনের কঠিন মুহূর্তে তিনি গৃহবধূদের জন্য গর্ভধারণের কাজও করেছেন, যাতে অতিরিক্ত আয় করে নিজের ও সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবন তৈরি করতে পারেন।
স্বামীর চলে যাওয়ার পর বহু বারের প্রস্তাব পেয়েও তিনি পুনরায় বিবাহের দিকে ঝুঁকেননি, বরং নিজের স্বনির্ভরতা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার গল্পটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন নারীদের জন্য একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সমর্থন পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।
মাসুমা বর্তমানে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নিয়মিত মানসিক থেরাপি ও সঠিক ওষুধের ব্যবহারকে তার পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই ধরনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, মানসিক ও শারীরিক সংকটের সময় সঠিক চিকিৎসা, পরিবারিক সমর্থন এবং আত্মবিশ্বাসের পুনর্গঠনই পুনরায় স্বাস্থ্যের পথে অগ্রসর হওয়ার মূল উপাদান। আপনি যদি নিজের বা পরিচিতের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হন, তবে দ্রুত পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ করা এবং সমর্থন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
মাসুমার গল্পের শেষাংশে তিনি পাঠকদের প্রশ্ন করেন, “আপনার জীবনে কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে আপনি কীভাবে মোকাবিলা করবেন?” এই প্রশ্নটি সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও খোলামেলা আলোচনা উত্সাহিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।



