ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে। টিআইবির (ট্রায়াল ইনফরমেশন ব্যুরো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রার্থীদের ১৭.৬৯ শতাংশের ওপর মামলার হালচাল রয়েছে, যা দুই বছর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৯.৪০ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রার্থীর মোট সংখ্যা বিবেচনা করলে, অতীতে কোনো না কোনো সময় আদালতে দাঁড়িয়েছেন এমন প্রার্থীর সংখ্যা ৭৪০ জন, যা মোট প্রার্থীর ৩১.৬৪ শতাংশের সমান। অর্থাৎ, এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থীই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অপরাধের অভিযোগে আদালতে উপস্থিত হয়েছেন। এই হার পূর্বের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৯.৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের ১৬.৭৬ শতাংশের তুলনায় বেশি।
টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মামলাগুলোর মধ্যে আঘাতজনিত অপরাধ, জনশান্তি লঙ্ঘন, প্রাণঘাতী অপরাধ, ভীতিপ্রদর্শন, অপমান ও উৎপাত, প্রতারণা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যদিও সব মামলায় প্রমাণ বা দণ্ড নিশ্চিত হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে মামলায় হস্তক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা দলনেতা ও প্রার্থীরা প্রায়শই সরকারী দল থেকে বিভিন্ন সময়ে হয়রানিমূলক মামলাের শিকার হন। “বিএনপি বা বর্তমানে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দলগুলোর নেতারা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক মঞ্চে ছিলেন, ফলে সরকারী পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে নানা মামলা দায়ের করা হয়েছে,” টুলী বলেন। তিনি আরও যোগ করেন, মামলাগুলো বিচারিক প্রমাণ ও দণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত, যাতে অপরাধী কোনো রকমের স্বীকৃতি না পান।
এই তথ্যগুলো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, প্রার্থীদের পটভূমি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং অপরাধমূলক মামলায় জড়িত প্রার্থীদের নির্বাচনী যোগ্যতা নিয়ে স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা উচিত। এছাড়া, ভোটারদের সচেতনতা বাড়িয়ে তাদেরকে এমন প্রার্থীদের থেকে দূরে রাখতে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কিছু রাজনৈতিক দল তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে বিবেচনা করে। তারা দাবি করে, এমন মামলাগুলো প্রায়শই প্রমাণের অভাবের ভিত্তিতে দায়ের করা হয় এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বহন করে। এদিকে, সরকারী পক্ষের দৃষ্টিতে, আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সকল নাগরিকের সমান দায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং কোনো অপরাধমূলক কাজের জন্য দায়ী করা প্রয়োজনীয়।
ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রার্থীর পটভূমি যাচাইয়ের মানদণ্ড কঠোর করে, মামলার প্রকৃতি ও ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে। এধরনের পদক্ষেপগুলো ভোটারদের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং নির্বাচনের বৈধতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা জরুরি, যাতে মামলাগুলো ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচারিত হয়।
সংক্ষেপে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ওপর ফৌজদারি মামলার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্ব হল, প্রমাণভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা।



