শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা শহরের হাইকমিশন ভবনে অনুষ্ঠিত প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা উল্লেখ করেন, দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা জনগণ ও ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য বাস্তব সুবিধা এনে দিচ্ছে। তিনি বলেন, এই সাফল্যগুলো ভবিষ্যতে আরও দূরদর্শী পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করবে।
অনুষ্ঠানটি ভারতীয় হাইকমিশন কর্তৃক আয়োজিত এবং দেশের উঁচু পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। হাইকমিশনারের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
ভার্মা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় উভয় দেশের যৌথ ত্যাগের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তই দুই দেশের মধ্যে বিশেষ বন্ধন গড়ে তুলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনা ও নাগরিকদের সমর্থন বাংলাদেশী জনগণের জন্য অপরিবর্তনীয় স্মৃতি রয়ে গেছে।
সাংস্কৃতিক দিক থেকে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের রচনা উভয় দেশের মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে স্থান করে নিয়েছে। সাহিত্য, সঙ্গীত ও শিল্পকলার প্রতি এই ভাগাভাগি ভালোবাসা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, দুই দেশের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান গত কয়েক বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভার্মা উল্লেখ করেন, সংযুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার গতি ত্বরান্বিত হওয়ায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরের নিকটে আসছে এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা শক্তিশালী হচ্ছে।
শক্তি খাতে, ভারতীয় শোধনাগার থেকে বাংলাদেশে উচ্চগতির ডিজেল পরিবহনের জন্য একটি আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পটি জ্বালানি সরবরাহের সময়সীমা কমিয়ে উভয় দেশের শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
এর পাশাপাশি, ভারত ও নেপাল উভয় দেশের গ্রিড থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চালু হয়েছে। এই লাইনটি আঞ্চলিক জ্বালানি সংযোগের ভিত্তি স্থাপন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে ত্বরান্বিত করবে।
এইসব অবকাঠামো প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমে এবং শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পায়। হাইকমিশনার জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংযোগের মাধ্যমে উভয় দেশের শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
বস্ত্র শিল্পের ক্ষেত্রে, ভারতীয় সরবরাহ শৃঙ্খল বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই সহযোগিতা পোশাক উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করছে।
ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পেও সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা উভয় দেশের রোগীর জন্য সাশ্রয়ী ও গুণগত ওষুধের প্রবেশ নিশ্চিত করছে। ভার্মা উল্লেখ করেন, এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা স্বাস্থ্যসেবা খাতে উভয় দেশের নাগরিকের কল্যাণে সরাসরি অবদান রাখে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে হাইকমিশনার জানান, বর্তমান সাফল্যগুলোকে ভিত্তি করে আরও বিস্তৃত সহযোগিতা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, প্রণয় ভার্মার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে বাংলাদেশ-ভারত অংশীদারিত্ব কেবল ঐতিহাসিক বন্ধন নয়, বরং সমসাময়িক অর্থনৈতিক ও শক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তব সুবিধা প্রদান করছে, যা উভয় দেশের জনগণ ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।



