বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় অনুষ্ঠিত দোয়া মাহফিলে ভোটে অর্থপ্রদানের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল সমর্থকদের বিকাশ নম্বর দিতে বলছে এবং সেখান থেকে অর্থ পাঠাতে চাচ্ছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হতে পারে কিনা তা স্পষ্ট করা দরকার। এই প্রশ্নের পটভূমি ছিল ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজন করা অনুষ্ঠান, যেখানে শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্মরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানটি কোকোর মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে অনুষ্ঠিত হওয়ায় উপস্থিতদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের সংখ্যা বেশী ছিল। রিজভী এই সমাবেশে তার বক্তব্যের সূচনা করেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দল সমর্থকদের বিকাশ নম্বর চেয়ে তা থেকে অর্থ পাঠানোর প্রস্তাব দিচ্ছে, তা নির্বাচনী আইন অনুযায়ী অনুমোদিত কিনা তা জানার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের দাবি তিনি কোনো সংবাদপত্রে পড়েছেন এবং তা তার নিজের কথা নয়।
রিজভী বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—আমাদের জন্য কাজ করুন, আপনার বিকাশ নম্বর দিন, আমরা সেখানে কিছু পাঠাব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন প্রস্তাবের ফলে ভোট কেনা-বেচা ঘটতে পারে এবং তা নির্বাচনী আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অর্থ দিয়ে ভোট কেনা কি আইনগতভাবে নিষিদ্ধ নয়।
মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রিজভী আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, কোকোর মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক রোগের ফল নয়, বরং ফ্যাসিবাদী শাসনের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের পরিণতি। রিজভী অতীতের রাজনৈতিক দমনকে উদাহরণ দিয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়কে বালু ও কাঠের ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করার ঘটনা উল্লেখ করেন।
সেই সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের চোখে গোলমরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ করা হয়েছিল, রিজভী জানান। তিনি বলেন, এই নিপীড়নের দৃশ্য কোকো দূর মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি দেখেছিলেন, যখন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কোকো তার মায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের দৃশ্য দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন।
কোকোর দেহ দেশে পৌঁছানোর পর, টেলিভিশনে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়া তার কন্যা সন্তানকে কোলে নিয়ে শোক প্রকাশ করছেন। রিজভী উল্লেখ করেন, শোক জানাতে গিয়ে উপস্থিত বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, চিকিৎসক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা গুলো রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
রিজভী জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে স্মরণ করে বলেন, ঐ সময়ের রক্তস্রোত ও ত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ঐ আন্দোলনের ফলে রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে শুরু করে, তবে এখনও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অবৈধ অর্থপ্রদানের প্রচেষ্টা রয়ে গেছে।
রিজভীর বক্তব্যের পর, উপস্থিত কিছু নেতা-সদস্যের কাছ থেকে প্রশ্ন উঠে যে, বিকাশের মাধ্যমে ভোট প্রভাবিত করা নির্বাচনী আচরণবিধির কোন ধারা লঙ্ঘন করে। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি, রিজভী দাবি করেন যে নির্বাচন কমিশনকে এই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিএনপি দলের অভ্যন্তরে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালু হয়েছে। কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রিজভীর উদ্বেগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ভোটে অর্থপ্রদানের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে তা কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এই অভিযোগকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখার মত মতামতও প্রকাশ পেয়েছে।
অবশ্যই, নির্বাচন কমিশন এই ধরনের অভিযোগের প্রতি সংবেদনশীলভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য সকল রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হল, ভোটারকে কোনো ধরনের আর্থিক প্রলোভন না দিয়ে স্বেচ্ছায় ভোট দিতে উৎসাহিত করা। রিজভীর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে, ভবিষ্যতে বিকাশের মাধ্যমে অর্থপ্রদানের কোনো প্রচেষ্টা ধরা পড়লে তা নির্বাচন কমিশনের নজরে আসবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কারণ ভোটে অর্থপ্রদানের অভিযোগ নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। রিজভীর উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলে, তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে এবং ভোটারদের আস্থা হ্রাস করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, রুজুল কবির রিজভীর প্রশ্ন ভোটে বিকাশের মাধ্যমে অর্থপ্রদানের সম্ভাবনা এবং তার আইনি প্রভাব নিয়ে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ থাকে।



