ইউএস পেন্টাগন শনিবার ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলপত্র প্রকাশ করে, যেখানে চীনকে আর শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না ধরে, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা সমস্যায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এই নথি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিবেদন হয়েছে এবং মার্কিন সরকারের নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে।
নতুন কৌশলে চীনকে ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হল যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর আধিপত্য বিস্তার রোধ করা। তাই চীনকে বাধা দেওয়ার চেয়ে তার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইউএস পেন্টাগনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার এখন দেশীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পশ্চিম গোলার্ধের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা। এদিকে, পূর্বে বেইজিংকে শীর্ষ হুমকি হিসেবে গণ্য করা সময়ের তুলনায় এখন তা সীমিত করে দেখা হবে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় চীনকে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, নতুন নথি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে গিয়ে আরও বিস্তৃত কৌশলগত দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করেছে। এই পরিবর্তনটি ট্রাম্পের শেষ বছরের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের ভিত্তিতে তৈরি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ইন্দো‑প্যাসিফিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছিল।
ট্রাম্পের কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ‘গুরুত্বপূর্ণ, তবে সীমিত’ সামরিক সহায়তা প্রদান করার ইঙ্গিত ছিল। নতুন নথিতে একই নীতি পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে মিত্র দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেওয়া হয়, তবে অতিরিক্ত নির্ভরতা না গড়ে ওঠে।
কৌশলপত্রে ‘দৃষ্টিভঙ্গি, মনোযোগ ও ভাষায় তীক্ষ্ণ পরিবর্তন’ প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে, যাতে ‘বিপর্যয়ের পথে থাকা’ পুরনো পথ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করার দিকে অগ্রসর করা যায়। এই রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন নীতি নির্ধারণের ভিত্তি হবে।
নতুন কৌশল প্রকাশের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বহু মিত্রের মধ্যে অস্বস্তি বাড়তে পারে, কারণ পূর্বে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা এবং ন্যাটো সেনাদের আফগান যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেওয়ার মন্তব্যের ফলে ইউরোপের সঙ্গে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এই বিষয়গুলো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইউএস পেন্টাগন স্পষ্ট করে বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র আর বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিতে থাকবে না এবং মিত্র দেশগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে, দেশীয় নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বেশি মনোযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পশ্চিম গোলার্ধে ‘গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড’ রক্ষা করার কথা কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ত্যাগ না করা হয়। এতে আর্কটিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড এবং গালফ অব মেক্সিকো অন্তর্ভুক্ত।
ইউএস পেন্টাগন এছাড়াও উল্লেখ করেছে যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং সহযোগিতা আর্কটিকের বরফ শিখর থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যা বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা কাঠামোর একটি নতুন ভারসাম্য গড়ে তুলবে।
এই নীতি পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে, কৌশলটি এখনও বাস্তবায়নের প্রথম ধাপেই রয়েছে, এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতির সমন্বয় কীভাবে হবে তা দেখা বাকি।
সারসংক্ষেপে, ইউএস পেন্টাগনের ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল চীনকে শীর্ষ হুমকি না বলে, দেশীয় চ্যালেঞ্জ এবং পশ্চিম গোলার্ধের নিরাপত্তা সমস্যায় অগ্রাধিকার দেয়ার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে। এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও সামরিক নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



