মুন্সিগঞ্জের গাজারিয়া উপজেলা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এপিআই (সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান) ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ২০০ একর জমিতে এখনও অধিকাংশ অংশ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই। ২০০৮ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি দেশের ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছিল, তবে দুই দশকের বেশি সময় পার হওয়া সত্ত্বেও কার্যকরী অবস্থা অর্জন করা যায়নি।
পার্কের প্রবেশদ্বার থেকে দেখা যায় সোজা পাকা রাস্তা ও আম গাছের ছায়া, তবে এগুলোই একমাত্র সুশৃঙ্খল দৃশ্য। বর্বর জঙ্গলে ঘেরা অধিকাংশ প্লট এখনও অপ্রযুক্ত, কোনো নির্মাণের চিহ্ন দেখা যায় না। মোট ২৬টি প্লটে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে বরাদ্দ করা হলেও, বাস্তবে মাত্র কয়েকটি ভবনই দাঁড়িয়ে আছে; বাকি সব জায়গা ঘন জঙ্গলে ঢাকা।
এখানে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে হেলথকেয়ার ফরমুলেশনস লিমিটেডের অবস্থা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও, কোম্পানিটি এখন প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার ঋণ কিস্তি পরিশোধে বাধ্য। এই আর্থিক চাপের ফলে কোম্পানির নগদ প্রবাহে বড় ধাক্কা লেগে রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ওষুধের কাঁচামাল আমদানি কমিয়ে, স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদনকে উৎসাহিত করা। এধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলে ফার্মা শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়বে, পাশাপাশি রোগীর জন্য ওষুধের দাম কমে যাবে। তবে বাস্তবায়নের ধীরগতি এই লক্ষ্যকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
অনুমোদনের পর থেকে জমি উন্নয়ন ও সড়ক নির্মাণের কাজ মূলত সম্পন্ন হয়েছে, তবে মৌলিক ইউটিলিটি—বৈদ্যুতিক, পানি, গ্যাস ও স্যাম্পলিং সুবিধা—অপূরণীয় রয়ে গেছে। এই অবকাঠামোগত ঘাটতি সরাসরি উৎপাদন লাইনের স্থাপনা ও কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় মেশিনারি ও কর্মী নিয়োগে দ্বিধা বোধ করছেন।
ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের জন্য এপিআই পার্কের অপ্রতুলতা বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বাড়িয়ে তুলেছে। দেশের বড় অংশের ওষুধের কাঁচামাল এখনো বিদেশ থেকে আনা হয়, যা মুদ্রা ব্যয় বাড়ায় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পার্কের সম্পূর্ণ কার্যকরী হওয়া মানে এই নির্ভরতা কমে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
বিলম্বের ফলে আর্থিক ক্ষতি শুধু বিনিয়োগকারীরই নয়, পুরো শিল্পেরই। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে না পৌঁছানোর ফলে ঋণসুবিধা, কর রেহাই ও অন্যান্য প্রণোদনা হারিয়ে গেছে। এছাড়া, সম্ভাব্য রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও নষ্ট হয়েছে।
অবস্থা উন্নত করতে সরকারকে অবিলম্বে ইউটিলিটি সরবরাহের জন্য পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করতে হবে এবং পার্কের পরিচালনা কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আর্থিক বোঝা কমাতে সুদহ্রাস বা মেয়াদবর্ধনের মতো নীতি সমর্থন করা জরুরি। এধরনের সমর্থন না পেলে পার্কের পুনরুজ্জীবন দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, যদি পার্কের অবকাঠামো দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং উৎপাদন লাইনের অনুমোদন দ্রুত হয়, তবে দেশের ফার্মা শিল্পের বৃদ্ধির হার আগামী পাঁচ বছরে ১০-১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অন্যদিকে, অব্যাহত বিলম্বের ফলে বিদেশি কাঁচামালের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, গাজারিয়ার এপিআই পার্কে জমি ও সড়ক প্রস্তুত হলেও, মৌলিক ইউটিলিটি ও শিল্প সুবিধার অভাবে প্রকল্পটি কার্যকরী অবস্থায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগকারীদের আর্থিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ ফার্মা লক্ষ্যও পিছিয়ে পড়েছে। অবিলম্বে নীতি সমর্থন ও অবকাঠামো সম্পন্ন করা না হলে এই প্রকল্পের সম্ভাবনা ঝুঁকির মুখে থাকবে।



