গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদ ‘দ্য বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ অনুমোদন করে। এতে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) আর সুদ হার নির্ধারণে সরকারী অনুমোদনের প্রয়োজন না রাখে। একই সঙ্গে সংস্থার পরিচালনা পর্ষদকে সরকারকে প্রদানযোগ্য লভ্যাংশের পরিমাণও নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে যুক্ত নতুন বিধানগুলো সংস্থার আর্থিক স্বায়ত্তশাসনকে দৃঢ় করে। পূর্বে ঋণের সুদ হার ও লভ্যাংশের হার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নির্ধারণ করত, যা এখন পরিবর্তিত হয়ে সংস্থার নিজস্ব সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত হবে।
বিএইচবিএফসি এখন নিজেই বাজারের পরিস্থিতি ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে সুদ হার নির্ধারণ করতে পারবে। এর ফলে ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হবে, যা ঋণগ্রহীতা ও সংস্থার উভয়ের জন্যই সুবিধাজনক।
লভ্যাংশের ক্ষেত্রে পূর্বে বাংলাদেশ সরকারকে সংস্থার নিট মুনাফার সম্পূর্ণ অংশ প্রদান করতে হতো। নতুন বিধান অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণের স্বাধীনতা পাবে, ফলে অবশিষ্ট অংশ সংস্থার রিটেইন্ড আর্নিং হিসেবে সংরক্ষণ করা যাবে। এই তহবিল ভবিষ্যতে ঋণ প্রদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ব্যবহার করা হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের মতে, অধ্যাদেশের অনুমোদন সংস্থার আর্থিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আরও বেশি মানুষকে সাশ্রয়ী গৃহঋণ সেবা প্রদান সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, স্বায়ত্তশাসন সংস্থার কার্যকরী দক্ষতা ও গ্রাহক সেবার মান উন্নত করবে।
বিএইচবিএফসি ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে গৃহনির্মাণ ও আবাসন ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পূর্বে থেকেই পরিকল্পিত আবাসন নির্মাণে ঋণ প্রদান করে আসছে সংস্থা, যা দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়ক।
বর্তমানে সংস্থা দেশের ৭৩টি শাখা ও কার্যালয়ের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে। নগর, মহানগর এবং গ্রামীণ উপজেলাগুলোতে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়। এই বিস্তৃত উপস্থিতি সংস্থার বাজারে প্রবেশযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিএইচবিএফসি অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম সুদে ঋণ প্রদান করে। বর্তমানে সুদ হার ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
কম সুদে ঋণ প্রদান করার ফলে সংস্থার চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তহবিলের উৎস মূলত সরকারী ঋণ ও মূলধন সহায়তা, অন্য কোনো স্বতন্ত্র তহবিলের প্রবাহ সীমিত। তাই তহবিল সংকট মোকাবেলায় স্বায়ত্তশাসন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন বিধান সংস্থার আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ রিটেইন্ড আর্নিং ব্যবহার করে ঋণ পোর্টফোলিও সম্প্রসারণ, ডিফল্ট ঝুঁকি হ্রাস এবং গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন করতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তন গৃহঋণ বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র করবে এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদ নীতি পুনর্বিবেচনার দিকে ধাবিত করতে পারে। তবে সুদ হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়লে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে, তাই সুদ নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন।
সংস্থার স্বায়ত্তশাসন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণ প্রক্রিয়া দ্রুততর এবং শর্তাবলী নমনীয় হতে পারে। এটি গৃহনির্মাণের স্বপ্ন পূরণে নিম্নমধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
সারসংক্ষেপে, ‘বিএইচবিএফসি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ সংস্থার সুদ হার ও লভ্যাংশ নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারী অনুমোদন থেকে মুক্ত করে, যা আর্থিক স্বনির্ভরতা ও বাজার প্রতিযোগিতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



