২ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশ সরকার ঐতিহাসিক দ্বৈত ভোটের আয়োজন করছে; একই দিনে সংসদীয় নির্বাচন এবং জাতীয় চাটার রেফারেন্ডাম অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের কাছে দুটি পৃথক প্রশ্ন উপস্থাপিত হবে – একটিতে পার্টি ভিত্তিক প্রতিনিধিদের নির্বাচন এবং অন্যটিতে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ চিহ্নের মাধ্যমে সংবিধানিক সংস্কার অনুমোদন। এই দুই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেফারেন্ডামটি একটি রঙিন ব্যালটে উপস্থাপিত হবে, যেখানে ভোটারকে ‘হ্যাঁ’ চিহ্ন দিলে পরবর্তী সংসদকে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গঠন করতে হবে। এতে অ-দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ১০০ সদস্যের উপরের সংসদ (সেনেট) গঠন এবং ৩০টি নির্দিষ্ট সংস্কার বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমা এবং বিচারিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা রয়েছে। এই সংস্কারগুলো ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হবে।
সংবিধানিক পরিবর্তনের পরিধি বিশাল; চাটার মধ্যে মোট ৮০টিরও বেশি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবিত। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এই সংস্কারগুলো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে, আর ‘না’ ভোট দিলে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। ফলে ভোটারদের জন্য সিদ্ধান্তটি সরল হলেও তার প্রভাব বহু প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হবে।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১২.৭ কোটি অতিক্রম করেছে, তবে বহু তরুণ ভোটার জানান যে রেফারেন্ডামের বিষয়বস্তু এখনও দূরবর্তী এবং জটিল মনে হয়। তথ্যের অভাব এবং নির্বাচনী উন্মাদনা এই গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানিক প্রশ্নকে পটভূমিতে ঠেলে দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে অন্তবর্তীকালীন সরকার রেফারেন্ডামের ‘হ্যাঁ’ ফলাফলের জন্য সর্বোচ্চ প্রচার চালাচ্ছে। সরকার সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি ব্যাপক প্রচারাভিযান শুরু করেছে এবং বেসরকারি ব্যাংক ও এনজিওগুলোকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করেছে। তাদের মূল বার্তা স্পষ্ট: ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সব সংস্কার কার্যকর হবে, ‘না’ ভোটে কিছুই পরিবর্তন হবে না।
প্রচারণা কার্যক্রমে পোস্টার, রেডিও, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একসাথে প্রচার চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, সরকারী কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবক দলগুলো গ্রামগ্রাম ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা রেফারেন্ডামের গুরুত্বকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রাখে।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আলি রিয়াজের বিশেষ সহকারী এই প্রচারকে আইনগত বাধা না থাকায় বৈধ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার জনপ্রিয় আন্দোলন থেকে উদ্ভূত হয়ে সংস্কারের ম্যান্ডেট পেয়েছে এবং রেফারেন্ডামকে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থেকে রক্ষা করার একটি সুরক্ষা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, কিছু নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেফারেন্ডামের সময়সূচি এবং প্রচারাভিযানকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশ্রিত হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, রেফারেন্ডামের জটিলতা ও তার ফলাফলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে যথাযথ জনসচেতনতা না থাকলে ভোটাররা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
যদি রেফারেন্ডামে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়, তবে অন্তবর্তীকালীন সরকার উল্লেখিত ৩০টি সংস্কারসহ নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গঠনের জন্য সংসদকে বাধ্য করবে। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উপরের সংসদের গঠন এবং বিচারিক স্বায়ত্তশাসনের মতো মৌলিক পরিবর্তন বাস্তবায়িত হবে। অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের ফলাফল হলে বর্তমান সংবিধানিক কাঠামো বজায় থাকবে এবং কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না।
দ্বৈত ভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করবে, তাই ভোটারদের জন্য এই মুহূর্তে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার ও নাগরিক সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব হলো ভোটারদের যথাযথ তথ্য সরবরাহ করা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।



