মার্চের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রকাশিত মন্তব্যের পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে বিশাল অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বার্তা, যা ইরানের বিরুদ্ধে বৃহৎ নৌবহর পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো নিরাপত্তা উদ্বেগের ভিত্তিতে তাদের ফ্লাইটগুলো স্থগিত বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লুফথানসা, কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইন্স এবং এয়ার ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি প্রধান এয়ারলাইন ২৪ জানুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট রুটে সেবা বন্ধ করেছে। এয়ার ফ্রান্সের একটি বিবৃতি অনুযায়ী, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি দুবাই গন্তব্যে তাদের সব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে, কারণ বর্তমান পরিস্থিতি উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেছে। কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইন্স অনির্দিষ্টকালীন সময়ের জন্য দুবাই, রিয়াদ, দাম্মাম এবং তেলআবিবে চলাচল বন্ধ করেছে এবং ইরান, ইরাক, ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরের বেশ কয়েকটি দেশের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ এবং এয়ার কানাডা ও ইসরায়েলে তাদের সেবা বন্ধ করেছে, ফলে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই পদক্ষেপগুলো বীমা খরচের বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ফলে নেওয়া হয়েছে।
এই উত্তেজনার মূল কারণ হল গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ইরানে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী প্রতিবাদ। ইরানের কঠোর দমন নীতি নিয়ে ট্রাম্প বারবার সমালোচনা করে এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিলে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা থেকে সরে যাওয়ার গুজব ছিল, তবে তার পুনরায় আক্রমণাত্মক রেটোরিক এবং পারস্য উপসাগরে নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিমান সংস্থাগুলোর এই সিদ্ধান্তের ফলে কেবল আকাশপথে নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ইরান ও পারস্য উপসাগরের তেল রপ্তানি ও পরিবহন পথের ওপর সম্ভাব্য ব্যাঘাত গ্লোবাল তেলের দামকে উঁচুতে তুলতে পারে। তাছাড়া, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বাড়বে, যা কূটনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বৃদ্ধি করতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের কঠোর নজরদারির ঘোষণার পর থেকে তেহরানের শেয়ারবাজারে হ্রাস দেখা গেছে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অস্থিরতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তবে বিমান সংস্থাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী রুট পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ বন্ধের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বিমান সংস্থাগুলোর এই সতর্কতা আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের ওপরও প্রভাব ফেলবে। দুবাই, রিয়াদ এবং তেলআবিবের মতো প্রধান ব্যবসা কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণকারী ব্যবসায়িক ব্যক্তিরা বিকল্প রুট বা ভিন্ন পরিবহন মাধ্যম বেছে নিতে বাধ্য হতে পারেন। একই সঙ্গে, ইসরায়েল ও গাজা অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী মানবিক সাহায্য ও বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহেও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে, এই ধরনের বিমান চলাচলের বাধা কেবল স্বল্পমেয়াদী নয়, দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোকে এখনো স্পষ্ট নীতি নির্ধারণের প্রয়োজন, যাতে বাণিজ্যিক ও মানবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা কমে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা এবং ট্রাম্পের সামরিক হুমকি, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে একাধিক এয়ারলাইনকে ফ্লাইট বাতিলের দিকে ধাবিত করেছে। এই পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে, এবং ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ বাড়াবে।



