ঢাকা শহরের দুই তরুণের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেশের অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে তা প্রকাশ করেছে। প্রথম ব্যক্তি, ২৪ বছর বয়সী এক যুবক, উত্তর‑পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা, গত ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন সকালে ছোট সাদা বোতল থেকে ওষুধ গ্রহণের রুটিন গড়ে তুলেছেন। ওজন হ্রাস ও শারীরিক দুর্বলতা লক্ষ্য করার পর বন্ধুদের পরামর্শে তিনি এইচআইভি পরীক্ষা করান এবং ফলাফল পজিটিভ আসে। পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি এবং তার বন্ধুরা ইনজেক্টেবল ড্রাগ ব্যবহার করার সময় একই সুচ ব্যবহার করায় ভাইরাসটি তার দেহে প্রবেশ করে।
দক্ষিণ‑পূর্ব ঢাকার আরেক তরুণের কেসেও একই বছর নভেম্বর মাসে একই ফলাফল দেখা যায়। তিনি বহু সমলিঙ্গী সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ফলে সংক্রমিত হয়েছেন বলে চিকিৎসকরা অনুমান করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এআরটি সেন্টার থেকে নিয়মিত অ্যান্টি‑রেট্রোভাইরাল থেরাপি ও পরামর্শ গ্রহণ করছেন। উভয়ই তাদের পরিচয় গোপন রাখতে চায়, যদিও তারা পূর্বে সামাজিক দলে সক্রিয় ছিলেন।
এই দুই কেসের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে এইচআইভি আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রোগ নয়; এটি তরুণ সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে, প্রায়শই অজান্তেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার গত বছরের তুলনায় দশ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা নতুন কেসের মধ্যে ৪২ শতাংশ গঠন করেছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই অনুপাত ছিল ৩১.৫ শতাংশ।
রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যশোরে ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত কেসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও সুনির্দিষ্ট শতাংশ এখনও প্রকাশিত হয়নি। এই তথ্যগুলো নির্দেশ করে যে শহর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, যৌন সম্পর্ক ও ড্রাগ ব্যবহারের বিষয়ে ভুল ধারণা, সুরক্ষা সামগ্রীর অপ্রাপ্যতা এবং তথ্যের অভাবই তরুণদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণ। তারা উল্লেখ করেন, যৌন শিক্ষা প্রোগ্রামগুলো যদি স্কুল ও কলেজে ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ডাক্তাররা আরও জোর দিয়ে বলেন, সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা মাত্রই দ্রুত পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। অ্যান্টি‑রেট্রোভাইরাল থেরাপি সঠিকভাবে গ্রহণ করলে রোগের অগ্রগতি ধীর হয় এবং জীবনের মান উন্নত হয়। তাই সংক্রমণ সন্দেহ হলে গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিত।
সরকারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত কেসের মধ্যে ৪২ শতাংশ অবিবাহিত তরুণ-তরুণী। এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে। এ ধরনের প্রবণতা মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।
বিভিন্ন এনজিও এবং যুব সংগঠন ইতিমধ্যে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করেছে, যেখানে সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ, বিনামূল্যে পরীক্ষা এবং পরামর্শ সেবা প্রদান করা হয়। তবে এই উদ্যোগগুলোকে আরো বিস্তৃত করতে এবং গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত সম্পদ ও সমন্বয় প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, তথ্যভিত্তিক নীতি গঠন এবং তরুণদের বাস্তবিক চাহিদা অনুযায়ী সেবা প্রদানই দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ হ্রাসের মূল চাবিকাঠি। এছাড়া, সামাজিক কলঙ্ক দূর করে গোপনীয়তা রক্ষা করা রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করবে।
এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার পেছনে মূল কারণগুলো হল কৌতূহল, অজ্ঞতা এবং সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব। তাই সরকার, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌন শিক্ষা, টেস্টিং সেন্টার এবং পরামর্শ সেবা একত্রে চালু করতে হবে।
অবশেষে, তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়: আপনি কি নিজের এবং পারিপার্শ্বিকের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত? আপনার উত্তরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ভিত্তি গড়ে তুলবে।



