লন্ডনের একটি দোকানে কাজ করা ২১ বছর বয়সী ডিলারার লাঞ্চ বিরতির সময় এক উচ্চকায় পুরুষ তার দিকে এগিয়ে এসে রেড হেয়ার নিয়ে মন্তব্য করে ফোন নম্বর চায়। কথোপকথনের সময় পুরুষটি তার স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে গোপনে ভিডিও রেকর্ড করে, যা সাধারণ চশমার মতো দেখায় কিন্তু ছোট ক্যামেরা যুক্ত। রেকর্ড করা ফুটেজ টিকটকে আপলোড করা হয় এবং ১.৩ মিলিয়ন ভিউ পায়। ভিডিওতে ডিলারার ফোন নম্বর দৃশ্যমান হওয়ায় তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রচুর কল ও মেসেজের সম্মুখীন হন, যা তার মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই ধরনের গোপন রেকর্ডিংয়ের ধারাবাহিকতা রয়েছে। লন্ডনের ঘটনায় জড়িত পুরুষটি টিকটকে বহু গোপন ভিডিও পোস্ট করে, যেখানে তিনি পুরুষদেরকে নারীর কাছে কীভাবে এগোতে হবে তা নিয়ে পরামর্শ দেন। এই ভিডিওগুলোতে ব্যবহার করা স্মার্ট গ্লাসটি মেটা কোম্পানির প্রযুক্তি, যা গোপন রেকর্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যায়।
অন্যদিকে, ৫৬ বছর বয়সী কিমকে গত গ্রীষ্মে ওয়েস্ট সাসেক্সের একটি সমুদ্রতটে একই ধরনের গোপন রেকর্ডিংয়ের শিকার করা হয়। এক অপরিচিত পুরুষ তার বিকিনি প্রশংসা করে কথোপকথন শুরু করে, তার বাসস্থানের তথ্য জানতে চায় এবং ইনস্টাগ্রামে যুক্ত হতে চায়। কিম তার কাজের জায়গা ও পারিবারিক তথ্য শেয়ার করে, যদিও তিনি জানতেন না যে তার কথোপকথন রেকর্ড হচ্ছে। পরে ওই পুরুষটি দুইটি ভিডিও টিকটকে আপলোড করে, যেখানে তিনি ডেটিং পরামর্শের ছদ্মবেশে পুরুষদেরকে নারীর কাছে কীভাবে এগোতে হবে তা ব্যাখ্যা করেন। এই ভিডিওগুলো দ্রুতই ৬.৯ মিলিয়ন ভিউ অর্জন করে এবং ইনস্টাগ্রামে ১০ লক্ষেরও বেশি লাইক পায়।
বিবিধ পুরুষ প্রভাবশালী ব্যক্তি টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে অনুরূপ সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করছেন, যেখানে তারা নারীর সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল শেয়ার করেন। এসব ভিডিওতে অধিকাংশই গোপনভাবে রেকর্ড করা হয় এবং মেটা স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করা হয় বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই প্রভাবশালীরা তাদের পরামর্শের মাধ্যমে আর্থিক লাভের দাবি করে, যা অনলাইন নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থা (BBC) টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে শত শত অনুরূপ ভিডিও পর্যবেক্ষণ করেছে এবং উল্লেখ করেছে যে এ ধরনের কন্টেন্টের স্রষ্টা সংখ্যা দশকেরও বেশি। এই ভিডিওগুলোতে নারীর সম্মতি ছাড়া রেকর্ডিং, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং অনলাইন হয়রানির ঝুঁকি স্পষ্ট।
একজন ব্যবহারকারী ইউটিউবে নিজের ওপর করা গোপন রেকর্ডিংয়ের ভিডিও দেখার পর এই বিষয়টি তদন্তে মনোনিবেশ করেন। তিনি নিজেও “লেস্টার স্কোয়ারে কিউট ব্লন্ডকে পিক আপ করা” শিরোনামের ভিডিওতে দেখা পান, যা দেখায় যে তিনি একা না। ডিলারা ও কিমসহ মোট সাতজন নারী এই ধরনের গোপন রেকর্ডিংয়ের শিকার হয়েছে।
ব্রিটিশ পুলিশ ও ডেটা সুরক্ষা সংস্থা বর্তমানে এই ধরনের গোপন রেকর্ডিং ও অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। গোপন ক্যামেরা ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি ও তা সামাজিক মিডিয়ায় প্রকাশ করা আইনগত দায়িত্বের আওতায় পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনাগুলো ডিজিটাল গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে পুনরায় আলোচনা উত্থাপন করেছে। বিশেষ করে মেটা স্মার্ট গ্লাসের মতো প্রযুক্তি কীভাবে অপব্যবহৃত হতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, গোপন রেকর্ডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের তদারকি বাড়ানো জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন।
অধিকন্তু, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের নীতিমালা অনুসারে গোপন রেকর্ডিং ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের বিষয়বস্তু দ্রুত সরিয়ে ফেলা এবং দায়ী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা উচিত। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে গোপন রেকর্ডিং বিষয়ক অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে, যা ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
এই ধরনের অপরাধের শিকার নারীরা মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তাই তাদের সুরক্ষার জন্য আইনি সহায়তা ও মানসিক পরামর্শের ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি একসাথে কাজ করে গোপন রেকর্ডিং, অনলাইন হয়রানি এবং ডেটা অপব্যবহার রোধে কার্যকর নীতি গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



