২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি, ভারতীয় শেয়ারবাজারে আদানি গ্রুপের দশটি সংস্থার মোট বাজার মূলধন প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১.২৫ লাখ কোটি রুপি) হ্রাস পায়। এই একক দিনের পতনের ফলে গৌতম আদানির ব্যক্তিগত সম্পদ মূল্য প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ডলার (৫৭০ কোটি ডলার) কমে, এবং ফোর্বসের ধনীদের তালিকায় তার র্যাঙ্ক ৩০ তম স্থানে নেমে আসে।
এই পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) এর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ রয়েছে। SEC আদালতে আবেদন করে গৌতম আদানি ও তার ভাই সাগর আদানিকে জালিয়াতি ও ঘুষের অভিযোগে সরাসরি ই‑মেইল মাধ্যমে সমন পাঠানোর অনুমতি চেয়েছে। ভারত সরকার গত বছর দুটি সমন জারির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও, এইবার SEC প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে অনুমোদন চেয়েছে, যা দেশের বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শেয়ারমূল্যের এই হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের দুটি প্রধান সূচক—সেন্সেক্স এবং নিফটি—ও উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে যায়। শুক্রবারের ট্রেডিং সেশনে মোট বিনিয়োগকারীর ক্ষতি প্রায় ৬.৮ লাখ কোটি রুপি হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই অস্থিরতা থেকে সরে যাওয়ার সংকেত দেখিয়ে রুপির মানেও অবনতি ঘটেছে; রুপি প্রতি সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড নিম্নগামী গতি বজায় রাখছে।
আদানি গ্রুপের শেয়ারদাম হ্রাসের পূর্বে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি ২৫ তারিখে হিনডেনবার্গের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে আদানি গ্রুপের জালিয়াতি ও শেয়ার মূল্যের কৃত্রিম বৃদ্ধি নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, যার ফলে একই সময়ে দশটি সংস্থার বাজার মূলধন প্রায় এক লাখ কোটি রুপি কমে যায়। যদিও সেই সময়ে বাজারে কিছু স্বস্তি দেখা গিয়েছিল, তবে SEC এর নথি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শেয়ারদাম পুনরায় নিচে নামতে থাকে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বিনিয়োগকারীরা আদানি গ্রুপের ওপর পূর্বে ধারিত দায়মুক্তির ধারণা ভেঙে গেছে। SEC এর নথি প্রকাশের পর শেয়ারদাম দ্রুত পতিত হওয়ায়, দেশের শেয়ারবাজারের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে, বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার এবং রুপি অবমূল্যায়নের ধারাবাহিকতা বাজারের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাও সূচকের ওঠা-নামায় প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত উত্তেজনা হ্রাস পেলে, ভারতের শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলো সাময়িকভাবে উত্থান দেখিয়েছিল। তবে SEC এর মামলার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্থান দ্রুতই নিঃশেষ হয়ে যায়।
আদানি গ্রুপের শেয়ারমূল্য হ্রাস এবং গৌতম আদানির সম্পদ হ্রাসের ফলে, দেশের শেয়ারবাজারে ঝুঁকি সচেতনতা বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ এবং দেশের আইনি পরিবেশের ওপর বেশি দৃষ্টি দেবেন। ভবিষ্যতে, যদি SEC সমন জারি করতে সক্ষম হয়, তবে আদানি গ্রুপের অন্যান্য সংস্থার শেয়ারদামেও অতিরিক্ত চাপ আসতে পারে, যা সামগ্রিক বাজারের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলবে।
বাজারের এই নতুন বাস্তবতা বিবেচনা করে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। বিশেষ করে, বিদেশি পুঁজি প্রবাহের ওপর নজরদারি এবং রুপি মানের পরিবর্তনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এবং আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



