ব্যবসা সংস্থার নেতারা নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে আইন-শৃঙ্খলা, সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসা সহজতর করার নীতিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বলছেন। তারা দাবি করছেন যে এই তিনটি দিকের স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্য-র পরিচালক ফয়সাল সামাদ উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা রাজনৈতিক দলগুলোর ম্যানিফেস্টোর শীর্ষে থাকা উচিত। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা ছাড়া শিল্পখাতের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব নয়।
সামাদ আরও জোর দিয়ে বলেন, শিল্পক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ইউটিলিটি মূল্যের হ্রাস না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা কঠিন হবে। বিদ্যুৎ ঘাটতি ও উচ্চ শক্তি খরচের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতায় ক্ষতি করছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার উৎপাদক ও রফতানিকার (BKMEA) সভাপতি মোহাম্মদ হাটেম শিল্পাঞ্চলে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন এবং শুল্ক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দ্রুততা রপ্তানি চেইনের সময়সীমা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
হাটেম ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক চার্জ এবং উচ্চ সুদের হারকে আরেকটি বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্টভাবে এই আর্থিক বোঝা কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সহজে ঋণ পেতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI) সভাপতি তাসকিন আহমেদও একই রকমের দাবি করেন। তিনি বলেন, ব্যবসা করার খরচ কমানো ম্যানিফেস্টোর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তাসকিনের মতে, রেলওয়ে, জলপথ ও বন্দর উন্নয়ন, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার সরলীকরণ এবং অবকাঠামো পরিকল্পনার সমন্বয় ব্যবসায়িক পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করবে। তিনি স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস ও ট্রেড সিস্টেমের বিস্তারের মাধ্যমে লিড টাইম কমানোর প্রস্তাব দেন।
শক্তি ঘাটতি মোকাবিলায় সময়সীমা নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি না থাকলে শিল্পখাতের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে, এ কথাও তাসকিন উল্লেখ করেন। তিনি জোর দেন, ম্যানিফেস্টোতে শক্তি সরবরাহের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ব্যবসা নেতাদের এই সমষ্টিগত দাবি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো আইন-শৃঙ্খলা, আর্থিক প্রবেশাধিকার এবং লজিস্টিক্স খরচ কমানোর পদক্ষেপকে ম্যানিফেস্টোর কেন্দ্রে রাখে, তবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়তে পারে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে।
অন্যদিকে, ম্যানিফেস্টোতে এই বিষয়গুলো বাদ দিলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে, যা ঋণগ্রহীতা ও রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করবে। উচ্চ সুদের হার এবং অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, ফলে রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাস পাবে।
নির্বাচনের আগে এই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্ট, সময়সীমা নির্ধারিত অর্থনৈতিক নীতি অন্তর্ভুক্ত করা না হলে ব্যবসা সম্প্রদায়ের আস্থা হারাতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সারসংক্ষেপে, আইন-শৃঙ্খলা, আর্থিক নীতি এবং ব্যবসা সহজতর করার রোডম্যাপকে ম্যানিফেস্টোর মূল বিষয় হিসেবে গৃহীত হলে দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।



