প্রিন্স হ্যারি শুক্রবার ন্যাটো সৈন্যদের আফগানিস্তান যুদ্ধে ত্যাগের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনামূলক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, এই ত্যাগকে সত্য ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা উচিত। তিনি নিজে দু’বার আফগানিস্তানে মোতায়েনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে, সেখানে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও হারানো সঙ্গীর কথা তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, “আমাদের কখনও ন্যাটো মিত্রদের প্রয়োজন হয়নি, আমরা কখনও তাদের কাছ থেকে কিছু চাইনি।” তিনি আরও যোগ করেন, ন্যাটো সৈন্যরা যদিও আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছে, তবে তারা সামনের সারির তুলনায় পেছনের দিকে ছিল। এই মন্তব্য মার্কিন সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
ব্রিটিশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের উক্তিকে “স্পষ্টতই অপমানজনক ও ভয়াবহ” বলে নিন্দা করেন এবং তিনি যদি এমন ভুল কথা বলেন তবে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে জোর দেন। স্টারমার এই মন্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো অংশগ্রহণের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লা সিকোরস্কি, যিনি আফগানিস্তানে ৩৩,০০০ পোলিশ সৈন্যের মধ্যে ছিলেন, তিনি বলেন, কোনো দেশ বা ব্যক্তি তাদের সৈন্যদের সেবা নিয়ে উপহাস করার অধিকার রাখে না। একইভাবে কানাডিয়ান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডেভিড জে.ও ট্রাম্পের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন, যা ন্যাটো জোটের ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
প্রিন্স হ্যারি ন্যাটো-র ২০০১ সালের প্রথমবারের মতো আর্টিকেল ৫ (৫ নম্বর অনুচ্ছেদ) প্রয়োগের উল্লেখ করেন, যা অনুযায়ী প্রতিটি মিত্র দেশকে মার্কিন সরকারের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে, যা যুদ্ধের বিস্তৃত পরিসরে প্রভাব ফেলেছে।
হ্যারি নিজে দুইবার আফগানিস্তানে মোতায়েনের সময় সেখানকার সৈন্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধন গড়ে তোলেন এবং যুদ্ধের কষ্টকর মুহূর্তে বহু সঙ্গীকে হারান। তিনি উল্লেখ করেন, “আমি সেখানে কাজ করেছি, সেখানে আমি আজীবন বন্ধু পেয়েছি এবং সেখানে আমি বন্ধু হারিয়েছি।” এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার মন্তব্যকে আরও প্রভাবশালী করে তুলেছে।
প্রিন্স হ্যারি যুদ্ধের মানবিক দিকেও আলোকপাত করেন, জানিয়ে দেন যে হাজার হাজার পরিবার এই সংঘর্ষে চিরতরে পরিবর্তিত হয়েছে। মা-বাবা সন্তানদের কবর দিয়েছেন, সন্তানরা বাবা-মা হারিয়েছেন এবং এখনও অনেক পরিবার এই ক্ষতির ভার বহন করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ত্যাগের কথা সত্য ও সম্মানের সঙ্গে বলা প্রয়োজন, কারণ সকল দেশ কূটনীতি ও শান্তির রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ।
এই বিতর্কের ফলে ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরে এবং যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে। ট্রাম্পের মন্তব্যের ফলে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও পারস্পরিক বিশ্বাসের প্রশ্ন উঠতে পারে, যা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। ব্রিটিশ সরকার এবং অন্যান্য জোটের সদস্য দেশগুলো ইতিমধ্যে এই বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, আফগানিস্তান যুদ্ধের স্মৃতি ও ত্যাগের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংবেদনশীলতা ও সম্মানজনক ভাষা প্রয়োজন। প্রিন্স হ্যারি এবং অন্যান্য নেতাদের মন্তব্য এই বিষয়ের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সংলাপ ও ন্যাটো জোটের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।



