২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় রোহিঙ্গা জনগণকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকার তীব্র আপত্তি জানায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই উপস্থাপন আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে এবং রোহিঙ্গাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়কে নিন্দা করে।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জনগণকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ও ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়নের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার তাদের ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’‑কে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপের রূপে বৈধতা দিতে চায়। বাংলাদেশ সরকার এই প্রচেষ্টাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ লুকানোর পরিকল্পিত কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছে।
মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গা একটি স্বতন্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে বর্মা রাজ্যের অংশ হওয়ার আগে থেকেই আরাকানে শতাব্দীর পর শতাব্দী বসবাস করে আসছে। ঐতিহাসিক দলিল, ঔপনিবেশিক রেকর্ড এবং আধুনিক গবেষণা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করে, ফলে তাদেরকে সাম্প্রতিক অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা ভিত্তিহীন।
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন জারির আগে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোটাধিকারও পেয়েছিল। এই আইন প্রণয়নের পরেও তারা নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়নি, যা মিয়ানমারের পূর্বের নীতি পরিবর্তনের সূচক।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘বার্মার আইনানুগ বাসিন্দা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। যদিও ২০১৭‑১৮ সালে মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তবে গত আট বছরে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তবিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ২০১৬‑১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযানকে মিয়ানমার সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করেছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে চিহ্নিত করা তাদের জাতিগত পরিচয়কে বিকৃত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
বাংলাদেশ সরকার উল্লেখ করেছে, যদিও রোহিঙ্গা ও চট্টগ্রামের কিছু ভাষাগত মিল আছে, তবে সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রথা এবং সামাজিক রীতিনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা তাদের স্বতন্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তাই ‘বাঙালি’ শব্দের ব্যবহার রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকারের একটি কৌশল।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এই বিষয়টি নিয়ে চলমান আলোচনায় পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে মিয়ানমার সরকারও তার অবস্থান উপস্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, আইসিজে‑এর রায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের দিক নির্ধারণ করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলবে।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা জনগণের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় স্বীকৃতি দিতে এবং মিয়ানমারের ‘বাঙালি’ উপস্থাপনকে প্রত্যাখ্যান করতে আহ্বান জানাচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবিক অপরাধের দায়িত্ব নির্ধারণই এখন আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য।



