ডিসেম্বর ১৮ তারিখে ঢাকা শহরের ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া সাউথ প্যাসিফিক (UAP)‑এর মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে কাজ করা সহকারী প্রফেসর লায়েকা বাশির এবং সহকারী প্রফেসর এএসএম মোহসিনকে চাকরি থেকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নোটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ছাত্রদের প্রতিবাদে সৃষ্ট পরিস্থিতি এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে।
বিরোধী কোনো প্রক্রিয়া না চালিয়ে, লায়েকা বাশিরকে প্রথমে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়। তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সংগ্রহ করা হয়। কমিটির কাজের সময়সূচি ও পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না দিয়ে, ছাত্রদের সমগ্র গোষ্ঠীকে অভিযোগ জানাতে বলা হয়।
লায়েকা বাশিরের মতে, যদি তার কোনো ধর্মবিরোধী মতামত থাকে, তবে তা সেমিস্টার মূল্যায়নের সময়ই ধরা পড়ত। তবে তিনি জানান, কমিটি গঠনের পর পুরো ছাত্রসংঘ থেকে অভিযোগ আহ্বান করা হয়, যা তার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে, এবং তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উভয় শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় ১০ ডিসেম্বরের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে। লায়েকা বাশির তার বন্ধুরা দেখতে পায় এমন একটি পোস্টে মুখোশ পরিধানের বিরোধিতা করেন, যদিও তিনি পর্দার অন্যান্য দিক নিয়ে কোনো আপত্তি প্রকাশ করেননি। পোস্টের শেষে তিনি মোহাম্মদপুরে ঘটিত এক হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ করেন, যেখানে এক গৃহকর্মী মা ও মেয়ের গায়ে মুখোশ পরিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
মোহাম্মদপুরের ওই ঘটনা স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় ছিল। গৃহকর্মী হত্যাকারী, শিকারের দেহে মুখোশ ও পোশাক ব্যবহার করে পুলিশকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিল। লায়েকা বাশিরের পোস্টে এই তথ্য যুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক মিডিয়ায় মুখোশের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা, তবে পোস্টটি বন্ধুত্বের সীমার মধ্যে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, স্ক্রিনশট ফাঁস হয়ে অনলাইন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
স্ক্রিনশট ফাঁস হওয়ার পর সামাজিক নেটওয়ার্কে লায়েকা বাশিরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অনেক ব্যবহারকারী তার মন্তব্যকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং তার চাকরি ছাড়ার দাবি জানায়। এই অনলাইন চাপের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হয় বলে অনুমান করা হয়।
এক সপ্তাহ পরে, লায়েকা বাশির একটি ক্ষমাপ্রার্থনা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি বলেন যে তার মন্তব্য ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে করা হয়েছিল এবং কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন যে, তার মন্তব্যের ফলে কোনো ব্যক্তির অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তিনি দুঃখিত। তবে ক্ষমাপ্রার্থনা প্রকাশের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকে।
এই ঘটনার পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ছাত্রদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ, শারীরিক হিংসা এবং অনলাইন মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রশাসনিক স্তরে যথাযথ সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার না পেলে, শিক্ষকেরা কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সমর্থন প্রকাশ করা হয়নি। বরখাস্তের নোটে শুধুমাত্র “ছাত্রদের প্রতিবাদে সৃষ্ট পরিস্থিতি” উল্লেখ করা হয়েছে, যা ঘটনার প্রকৃত কারণ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের এই ধরনের ঘটনা শিক্ষকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীর মতামত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তা শিক্ষকের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করা উচিত নয়।
পাঠকগণ যদি একই ধরনের পরিস্থিতি সম্মুখীন হন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নীতি ও শিকাগো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে লিখিতভাবে আপত্তি জানানো এবং আইনি পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে। আপনার মতামত ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, যাতে শিক্ষাক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।



