সিরাজুম মুনিরা ও ফেরদৌস আহমেদ, দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, বেসরকারি সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করার পর নিজস্ব উদ্যোগের সন্ধান পেয়েছিলেন। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে তারা দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়, রাজাবাসর গ্রামেই, মাত্র দশ হাজার টাকার মূলধন এবং বিশজন নারী কর্মী নিয়ে ‘সুতার কাব্য’ নামে একটি ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু করেন।
প্রাথমিকভাবে পাট ও সুতা ভিত্তিক হস্তশিল্প, তাঁত ও বুটিক পণ্যের উৎপাদনে মনোনিবেশ করা হয়। দেশজুড়ে বিভিন্ন কারখানা ও দোকান পরিদর্শনের পর তারা স্থানীয় কুশল কর্মী ও কাঁচামালকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত উৎপাদন শৃঙ্খল গড়ে তোলেন। এই কৌশলটি স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরিতে সহায়তা করে।
আট বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণের পথে অগ্রসর হয়েছে। কর্মীসংখ্যা বিশজন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে এখন পুরুষ ও নারীর সমন্বয়ে গঠিত, এবং মোট বিনিয়োগ এককোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাসিক আয় বিশ লক্ষ টাকার স্তরে পৌঁছেছে, যা শুরুর দশ হাজার টাকার তুলনায় শতগুণের বেশি।
মুনিরা ভাষাতত্ত্বে স্নাতক এবং থাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন; আর আহমেদ সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক এবং বরগুনা জেলায় বসবাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন থেকেই দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা পরে বিবাহে পরিণত হয় এবং ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
বৈবাহিক বন্ধনের পাশাপাশি দুজনের কর্মজীবনও ভিন্নমুখী ছিল। মুনিরা ২০০৭ সালে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, আর আহমেদ ব্যাংকিং খাতে কাজ শুরু করেন। তবে উভয়েরই চাকরির পাশাপাশি স্বতন্ত্র উদ্যোগের আকাঙ্ক্ষা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত সুতার কাব্য প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠার শুরুর সময় মূলধন সীমিত থাকলেও, দুজনের ভ্রমণপ্রিয়তা এবং দেশীয় হস্তশিল্পের প্রতি আগ্রহ তাদেরকে বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অভিজ্ঞতা পণ্য ডিজাইন ও গুণগত মান উন্নত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুতার কাব্যের পণ্য এখন শুধুমাত্র স্থানীয় বাজারেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারেও রপ্তানি করা হয়। আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে মান নিয়ন্ত্রণ ও প্যাকেজিংয়ে উন্নতি করা হয়েছে, যা রপ্তানি আয়কে স্থায়ী বৃদ্ধির পথে নিয়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। সুতার কাব্য এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে জুটের শৈলীতে আধুনিক নকশা যুক্ত করেছে, ফলে উচ্চ মূল্যের রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত বৃদ্ধি স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। বিশজন কর্মীর মধ্যে অধিকাংশই গ্রামীণ পটভূমির, যারা পূর্বে সীমিত আয়ের কাজ করতেন। এখন তারা স্থায়ী বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা পেয়ে জীবনের মানোন্নয়ন ঘটাচ্ছেন।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে মুদ্রা পরিবর্তনের প্রভাব, কাঁচামালের মূল্য ওঠানামা এবং পরিবহন খরচের বৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে চাপের মুখে ফেলতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি ও স্থানীয় কাঁচামাল সরবরাহের বিকল্প অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সুতার কাব্য নতুন পণ্য লাইন যোগ করার পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি বাড়ানোর লক্ষ্য রাখছে। এভাবে অনলাইন চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছিয়ে বিক্রয় চ্যানেল বৈচিত্র্যকরণ করা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে, দশ হাজার টাকার শুরুর মূলধন থেকে শুরু করে এখন মাসিক বিশ লক্ষ টাকার আয় অর্জন করা সুতার কাব্য, স্থানীয় শিল্পকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার একটি সফল উদাহরণ। পরিবেশবান্ধব পণ্য, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর অবদান ব্যবসা ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত প্রদান করে।
প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক উন্নয়ন ও বাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা মোকাবিলায় কৌশলগত পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। সুতার কাব্য যদি এই দিকগুলোতে সঠিক পদক্ষেপ নেয়, তবে আগামী বছরগুলোতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় শিল্পের পুনর্জাগরণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।



