সান্ড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে ডকুমেন্টারি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ‘American Doctor’ গাজা অঞ্চলে যুদ্ধের মাঝখানে কাজ করা তিনজন আমেরিকান চিকিৎসকের বাস্তব গল্প উপস্থাপন করে। পরিচালক পোহ সি টেং গৃহযুদ্ধের মানবিক দিককে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছেন, যেখানে চিকিৎসা ও নৈতিকতা রাজনৈতিক তর্কের উপরে রাখা হয়েছে।
ফিল্মটি গাজা অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসা সেবার জরুরি প্রয়োজনকে তুলে ধরে, তবে একই সঙ্গে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর (IDF) দ্বারা প্যালেস্টাইনি নাগরিকদের ওপর আক্রমণ, আহত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এই দ্বৈত দৃষ্টিকোণ চলচ্চিত্রকে শুধুমাত্র মানবিক নথি নয়, বরং নেটানিয়াহু সরকারের কড়া নীতি ও মার্কিন সরকারের সমর্থনের সমালোচনা হিসেবেও উপস্থাপন করে।
চলচ্চিত্রে ড. থেয়ার আহমেদ, ড. মার্ক পার্লমাটার এবং ড. ফেরোজ সিদহোয়া—তিনজন আমেরিকান ডাক্তারের কাজের ধারাবাহিকতা দেখানো হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই গাজার হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন এবং যুদ্ধের ধ্বংসের মাঝখানে রোগী রক্ষা করার জন্য অগ্রসর হচ্ছেন। তাদের পেশাগত পটভূমি ও মানবিক দায়িত্বের প্রতি অটুট প্রতিশ্রুতি চলচ্চিত্রের মূল স্তম্ভ গঠন করে।
গাজার জরুরি বিভাগে শিশুরা বোমা হামলার পর জরুরি সেবার জন্য নিয়ে আসা দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের সবচেয়ে কষ্টদায়ক অংশ। বোমা ধ্বংসের পর শিশুরা রক্তপাত ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে, এবং ডাক্তারেরা দ্রুত শল্যচিকিৎসা ও রেসকিউ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দৃশ্যগুলো দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে এবং যুদ্ধের মানবিক দিককে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
চিকিৎসকরা যে কঠিন পরিবেশে কাজ করছেন, তা সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং নিরাপত্তা হুমকির মাধ্যমে আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সীমান্তে চিকিৎসা সরবরাহের প্রবেশ নিষিদ্ধ, ফলে ড. পার্লমাটারকে নিজের লাগেজে স্ক্রাব ও অ্যান্টিবায়োটিক লুকিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এই ধরনের সীমাবদ্ধতা রোগীর জীবন রক্ষায় বড় বাধা সৃষ্টি করে।
ডাক্তারদের কাজ শুধুমাত্র শল্যচিকিৎসা নয়, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গাজার পরিস্থিতি জানাতে তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণেও ভূমিকা রাখেন। রোগীর অবস্থা, হাসপাতালের ক্ষমতা এবং সরবরাহের ঘাটতি সম্পর্কে তারা সরাসরি রিপোর্ট করে, যা মানবিক সহায়তা ও মিডিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
‘American Doctor’ মোট ১ ঘণ্টা ৩৩ মিনিটের দৈর্ঘ্য নিয়ে সান্ড্যান্সের ডকুমেন্টারি প্রতিযোগিতায় প্রদর্শিত হয়। চলচ্চিত্রের কাঠামো সরল, তবে গভীর; বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে সরাসরি শল্যচিকিৎসা কক্ষের বাস্তবতা ও রোগীর কষ্টকে কেন্দ্র করে। এই পদ্ধতি দর্শকের মনোযোগকে সরাসরি মানবিক দিকের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
পরিচালক পোহ সি টেং পূর্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন, তবে গাজা যুদ্ধের এই মানবিক দিককে তুলে ধরার জন্য তিনি প্রথমবারের মতো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের রাজনৈতিক আলোচনাকে পেছনে রেখে রোগীর জীবন রক্ষার বাস্তবতা তুলে ধরা।
ফিল্মে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর (IDF) দ্বারা গাজা অঞ্চলে করা আক্রমণ, বেসামরিক নাগরিকের ক্ষতি এবং অবকাঠামোর ধ্বংসের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই তথ্যগুলো নেটানিয়াহু সরকারের কড়া নীতি ও মার্কিন সরকারের সমর্থনের সমালোচনা হিসেবে কাজ করে, কারণ মার্কিন সরকার গাজা অঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমকে সমর্থন করে চলেছে।
সান্ড্যান্সে চলচ্চিত্রটি প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ও দর্শকরা এর মানবিক দিকের প্রশংসা করেছেন। যদিও চলচ্চিত্রটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, তবে অধিকাংশ সমালোচক এটিকে মানবিক সহানুভূতি ও চিকিৎসা নৈতিকতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
‘American Doctor’ গাজা যুদ্ধের মাঝখানে থাকা চিকিৎসকদের অবিচল প্রচেষ্টা ও মানবিক দায়িত্বকে তুলে ধরে, যা দর্শকদেরকে যুদ্ধের কাঁচা বাস্তবতা ও চিকিৎসা সেবার গুরুত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এই ধরনের ডকুমেন্টারি ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরোধী মানবিক উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হতে পারে।



