প্রচারের প্রথম দিনেই প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল, বিএনপি এবং জামায়াত-এ-ইসলামি, একে অপরের ওপর তীব্র সমালোচনা চালু করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ‑অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল, এবং এখন জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় উভয় দলই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য আক্রমণাত্মক রেটোরিক ব্যবহার করছে।
উদ্বোধনী সমাবেশে বিএনপি দলটি জামায়াত-এ-ইসলামির ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করা এবং ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ চালানোর অভিযোগ তুলে ধরেছে। এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তি করে দলটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
বিএনপি নেতা তারেক রহমান তার সাতটি জনসভায় জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি প্রতিটি জেলার স্থানীয় সমস্যাগুলোও তুলে ধরেছেন। তিনি কৃষি, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি উল্লেখ করে, নির্বাচনের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করেছেন। তার বক্তৃতা নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে।
গত শুক্রবার খুলনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে জামায়াত-এ-ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনের বর্ণনা ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে যুদ্ধের অস্ত্র ছিল তরবারি, তীর‑ধনুক ও কামান, আর এখন ভোটের ব্যালটই নতুন যুদ্ধের হাতিয়ার। এই রূপক ব্যবহার করে তিনি নির্বাচনের গুরুত্ব ও তীব্রতা প্রকাশ করেছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, কোনো মুসলমান আরেক মুসলমানকে কাফের বলে অভিহিত করা ধর্মীয় দায়িত্বের লঙ্ঘন এবং তা একটি গুরুতর অপরাধ। তিনি তীব্র ভাষায় উল্লেখ করেন, তারেক রহমান এখন বড় মুফতি হয়ে বিদেশ থেকে ফতোয়া জারি করছেন, যা ধর্মীয় কর্তৃত্বের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত।
পরওয়ারের মন্তব্যের পরও তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের জন্য সর্বোত্তম সমাধান হল নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন করা। তিনি রাজনৈতিক বিতর্ক ও পারস্পরিক সমালোচনা স্বাভাবিক স্বীকার করে, তবে তা যেন অতিরিক্ত উত্তেজনা না বাড়ায়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
জামায়াত-এ-ইসলামির পক্ষ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে অতীতের দুর্নীতি, নেতা‑কর্মীদের স্বার্থপর দখল ও চাঁদাবাজি, এবং ‘নব‑ফ্যাসিবাদ’ রূপে রূপান্তরিত হওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। দলটি দাবি করে, বিএনপি নেতৃত্বের কিছু সদস্যের আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক স্বার্থে জনসাধারণের সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেশের স্বার্থের বিপরীত।
দুই পক্ষই বিদেশি আধিপত্যের বিষয়কে কেন্দ্রে রাখছে। বিএনপি জামায়াত-এ-ইসলামিকে ‘পিন্ডি’ শব্দে সম্বোধন করে পাকিস্তানীয় হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, আর জামায়াত-এ-ইসলামি বিএনপির ওপর দিল্লি‑প্রভাবের অভিযোগ তুলে, ভারতের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উভয় দলই এই যুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের স্বতন্ত্রতা ও জাতীয় স্বার্থের রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে।
এই মুহূর্তে নির্বাচনী মাঠে উভয় দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা, এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ একসাথে রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উভয় দলই নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের তীব্র রেটোরিক নির্বাচনী পরিবেশকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে, তবে একই সঙ্গে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিভাজন বাড়াতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত থাকে।
অবশেষে, উভয় দলই একমত যে জাতীয় নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য অপরিহার্য। তবে তাদের পারস্পরিক অভিযোগ ও রেটোরিকের তীব্রতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার ধারা ও ভোটার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। সময়ই বলবে, এই উত্তেজনা কীভাবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলবে।



