সান্ডান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিশ্ব সিনেমা বিভাগে অংশগ্রহণকারী নতুন ফিলিপাইন চলচ্চিত্র ‘ফিলিপিনানা’ দেশের সামাজিক বৈষম্যকে কেন্দ্র করে এক অন্ধকারময় ও কল্পনাপ্রবণ গল্প উপস্থাপন করেছে। রাফায়েল ম্যানুয়েল পরিচালিত এই কাজটি ২০২১ সালে পুরস্কার জয়ী স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ভিত্তিতে তৈরি এবং ১৭ বছর বয়সী ইসাবেল (জরিবেল আগোতো) নামের এক তরুণীর কর্মজীবনের মাধ্যমে দেশের ধনী ও দরিদ্রের ফাঁককে উন্মোচিত করে।
ইসাবেলকে একটি গলফ ক্লাবের ‘টি-গার্ল’ হিসেবে নিয়োগ করা হয়; তার কাজ হল গলফ বলগুলোকে টিতে স্থাপন করা, যাতে ধনী ব্যবসায়ী ও চীনা পর্যটকরা নিজে তা না করতে হয়। গরম গ্রীষ্মের তাপে ক্লাবের ঘাসে দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, আর তার বেতন সীমিত বলে ধারণা করা হয়। এই সরল কাজটি চলচ্চিত্রের মূল রূপক, যা দেশের সম্পদ ও মানবশক্তি কয়েকজন অভিজাতের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার চিত্র তুলে ধরে।
চিত্রের পটভূমি একটি বিশাল গলফ কোর্স, যেখানে বেশিরভাগ কর্মী নারী, আর গ্রাহকরা হলেন শক্তিশালী পুরুষ ব্যবসায়ী ও ধনী ভ্রমণকারী। এই পুরুষরা কর্মীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে, যা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে তীব্র দৃশ্যগুলোর একটি। কর্মীদের কাজের পরিবেশকে অস্বস্তিকর ও হাস্যকর করে তোলার জন্য পরিচালক বেশ কিছু অতিরঞ্জিত দৃশ্য ব্যবহার করেছেন, যা বাস্তবের কষ্টকে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে।
চলচ্চিত্রে জরিবেল আগোতো, কারমেন কাস্টেলানোস, তেরয় গুজমান, কার্লিটোস সিগুইয়ন-রেইনা, ইসাবেল সিকাট এবং নূর হুশমান্ডের মতো অভিনেতারা প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের পারফরম্যান্সে তরুণী ইসাবেলের নির্লিপ্ততা থেকে শুরু করে ক্লাবের মালিক ডঃ প্যালাঙ্কার (টেরো) অপ্রত্যাশিত গানের পরিবেশনা পর্যন্ত সবকিছুই সূক্ষ্মভাবে ফুটে ওঠে।
রাফায়েল ম্যানুয়েল প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ‘ফিলিপিনানা’ তৈরি করেছেন; তিনি মূল স্বল্পদৈর্ঘ্য কাজের লেখক ও পরিচালকও ছিলেন। স্বল্পদৈর্ঘ্য সংস্করণটি ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছিল, যা তাকে এই দীর্ঘ সংস্করণে আরও গভীর সামাজিক বিশ্লেষণ যোগ করার সুযোগ দেয়।
দৃশ্যমান দিক থেকে চলচ্চিত্রটি অন্ধকারময় হাস্যরস ও সৃজনশীল চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। ম্যানুয়েলের সরল বর্ণনা শৈলীকে মাইকেল হানেকের তীব্রতা ও ডেভিড লিঞ্চের স্বপ্নময়তা দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে উল্লেখ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, টি-গার্লদের সমন্বিত নাচের দৃশ্যটি বড় স্ক্রিনের নাচের শৈলীর মতো সাজানো হয়েছে; একদিকে সাদা পোলোর শার্ট পরা পুরুষরা একসাথে ক্লাবের স্বিং করে, অন্যদিকে নারীরা একসাথে টিতে বল রাখে, যা দৃশ্যকে অস্বাভাবিকভাবে সমন্বিত করে।
অন্যান্য দৃশ্যগুলোতে অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী ফিলিপিনো গানের সুরে নাচে, আর ক্লাবের অদ্ভুত মালিক হঠাৎ করে ক্যারাওকে গাইতে শুরু করে, যা বাস্তব ও কল্পনার সীমানা মুছে দেয়। এসব মুহূর্তে চলচ্চিত্রের রঙের ব্যবহার, ক্যামেরার কোণ এবং সাউন্ড ডিজাইন একসাথে মিলে একটি স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে দর্শককে বাস্তবের কঠোরতা ও কল্পনার অদ্ভুততা একসঙ্গে অনুভব করতে হয়।
‘ফিলিপিনানা’ শুধুমাত্র একটি গল্প নয়; এটি দেশের প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদকে কয়েকজন অভিজাতের হাতে কেন্দ্রীভূত করার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। গলফ কোর্সের সবুজ ঘাস, সমুদ্রের নিকটবর্তী রিসোর্ট এবং ধনী পর্যটকদের বিলাসবহুল জীবনযাপনকে বিপরীতভাবে দেখিয়ে চলচ্চিত্রটি দেশের অর্থনৈতিক অসমতা ও পরিবেশগত শোষণের দিকে ইঙ্গিত করে।
সান্ডান্সে এই চলচ্চিত্রটি ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের দৈর্ঘ্যে বিশ্ব সিনেমা বিভাগে প্রতিযোগিতা করেছে। চলচ্চিত্রের শিরোনাম ও পরিচালক, অভিনেতা, সময়কাল ইত্যাদি তথ্য ফেস্টিভ্যালের অফিসিয়াল তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
সমালোচকরা চলচ্চিত্রের গাঢ় হাস্যরস ও ভিজ্যুয়াল উদ্ভাবনকে প্রশংসা করেছেন; যদিও বিষয়বস্তুটি দুঃখজনক, তবু ম্যানুয়েলের সূক্ষ্ম রসিকতা দর্শকের মনোযোগকে টানে এবং সামাজিক সমস্যার প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
বাংলা দর্শকদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি একটি নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, যেখানে ফিলিপাইনের সামাজিক কাঠামোকে শিল্পের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গলফ কোর্সের সবুজ ঘাসে ছড়িয়ে থাকা মানবিক কষ্ট ও হাস্যকর দৃশ্যগুলোকে একসঙ্গে উপভোগ করার মাধ্যমে দর্শকরা দেশের শ্রেণী বৈষম্যের বাস্তবতা ও তার অদ্ভুত প্রকাশকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। তাই, যদি আপনি সামাজিক সমস্যার উপর ভিত্তিক শিল্পকর্মে আগ্রহী হন, তবে ‘ফিলিপিনানা’ দেখার জন্য সময় বের করা উচিত।



