পোল্যান্ডের বিদ্যুৎ জালকে লক্ষ্য করে ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাইবার আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা অনুসারে, এই প্রচেষ্টা রাশিয়া সরকারের হ্যাকার দল দ্বারা পরিচালিত, যারা পূর্বে একই ধরণের জ্বালানি সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য পরিচিত। পোল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উপর কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আক্রমণকারীরা দুইটি তাপ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি উৎস, যেমন বায়ু টারবাইন ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার মধ্যে যোগাযোগ লাইনকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এই ধরণের হ্যাকিং প্রচেষ্টা জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে, বিশেষত শীতকালে তাপের চাহিদা বাড়ার সময়। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, হ্যাকাররা সিস্টেমের ডেটা মুছে ফেলার জন্য বিশেষায়িত ‘ওয়াইপার’ সফটওয়্যার ব্যবহার করেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, যদি আক্রমণ সফল হত তবে দেশের অর্ধ মিলিয়ন গৃহস্থালিতে তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারত। পোল্যান্ডের সরকার রাশিয়া সরকারের এই প্রচেষ্টাকে সরাসরি দায়ী করে এবং মস্কোকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। এই ঘটনা ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিবেশে সাইবার হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ESET গত শুক্রবার ধ্বংসাত্মক ম্যালওয়্যারের একটি নমুনা সংগ্রহ করে ‘DynoWiper’ নামে চিহ্নিত করেছে। ওয়াইপার ম্যালওয়্যার কম্পিউটারের ডেটা স্থায়ীভাবে মুছে ফেলে, ফলে সিস্টেম পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে যায়। ESET দল ‘মাঝারি আত্মবিশ্বাস’ নিয়ে এই সফটওয়্যারটি রাশিয়া সরকারের গোপনীয় গৃহযুদ্ধ গোষ্ঠী Sandworm-এর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে, যা পূর্বে গ্রু (GRU) এর অধীনে কাজ করত।
Sandworm গোষ্ঠী প্রথমবার ২০১৫ সালে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ জালকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, যার ফলে কিয়েভের ২৩০,০০০ গৃহস্থালিতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়। পরের বছরও একই গোষ্ঠী অনুরূপ সাইবার আক্রমণ চালায়, যা ইউক্রেনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। পোল্যান্ডের এই সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা প্রায় দশ বছর পর Sandworm-এর পুনরাবৃত্তি আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক উল্লেখ করেছেন, দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সফলভাবে হুমকি সনাক্ত ও প্রতিহত করেছে এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে বিপন্ন করা যায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সাইবার হুমকির মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। টাস্কের এই মন্তব্য দেশীয় ও বিদেশি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমর্থন জোগাচ্ছে।
NATO-র সেক্রেটারি জেনারেল সাম্প্রতিক সাইবার আক্রমণকে ‘সমষ্টিগত প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে উল্লেখ করে, এবং সদস্য দেশগুলোকে তাদের সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনও পোল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য সাইবার নিরাপত্তা তহবিল বৃদ্ধি এবং যৌথ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগগুলো আগামী মাসের EU শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পোল্যান্ডের সরকার ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ জালের ডিজিটাল নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করেছে এবং রাশিয়া সরকারের হ্যাকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি, পোল্যান্ড ও তার ন্যাটো মিত্র দেশগুলো যৌথ সাইবার অনুশীলন ও তথ্য শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে Sandworm-এর মতো হুমকির পূর্বাভাস ও প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী করতে চায়। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে এ ধরনের সাইবার আক্রমণ রোধে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছেন।



