দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে (FCC) অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা অডিও বার্তা দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের শাসনকে ‘অবৈধ ও সহিংস’ বলে সমালোচনা করেন এবং নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনের দিকে গমন করেছে বলে অভিযোগ করেন।
শেখ হাসিনা ২৪ই ফেব্রুয়ারি ঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের পর ভারতীয় ভূখণ্ডে নির্বাসিত অবস্থায় প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলছেন, অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও সংবিধানের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দেখছেন।
সংবাদ সম্মেলনটি এনডিটিভি (NDTV) আয়োজন করে, যার শিরোনাম ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’। এতে আওয়ামী লীগের বহু প্রাক্তন মন্ত্রী ও পার্টি নেতারা উপস্থিত ছিলেন, যদিও শেখ হাসিনা শারীরিকভাবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তার অডিও বার্তা সম্মেলনের মাঝখানে প্লে করা হয় এবং উপস্থিত নেতারা তার বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রশ্নের উত্তর দেন।
অডিওতে শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের ‘অবৈধ ও সহিংস’ শাসন পরিচালনার অভিযোগ তুলে, তাকে ‘পুতুল সরকার’ বলে অভিহিত করেন এবং বিদেশি স্বার্থের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের শাসনব্যবস্থা এখনো স্বতন্ত্রতা ও সংবিধানিক নীতির লঙ্ঘন ঘটাচ্ছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি তার সমালোচনা বিশেষভাবে তীব্র। তিনি ইউনূসকে ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ ইত্যাদি শব্দে অভিহিত করেন, যা তার নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের অবনতি নির্দেশ করে। এই রকমের তীব্র ভাষা ব্যবহার করে তিনি ইউনূসের নীতি ও কর্মকাণ্ডকে দেশের স্বার্থের বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করেন।
শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি ও মানবাধিকার প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষিত হয়েছে। এই বর্ণনা তার শাসনামলে বিরোধীরা যে সমালোচনা করত তা পুনরায় তুলে ধরে।
তিনি ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করে, সেই দিন থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে সন্ত্রাসের যুগের সূচনা হয়েছে বলে দাবি করেন। তার মতে, সেই দিন থেকে দেশের নিরাপত্তা অবস্থা অবনতি পেয়েছে এবং গণতন্ত্র এখনো নির্বাসনে রয়েছে।
শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান, বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত পুতুল সরকারকে উৎখাত করতে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের স্বায়ত্তশাসন ও সংবিধানিক কাঠামো পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি বা উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই আহ্বানটি তার পার্টির বিদেশি সমর্থকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
বিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী দল এই বক্তব্যকে ‘অত্যধিক তীব্র’ এবং ‘প্রমাণহীন’ বলে সমালোচনা করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে আনা কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি থেকে বিচ্যুত হতে পারে। তবে, এই ধরনের সমালোচনা দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
শেখ হাসিনার অডিও বার্তা এবং তার তীব্র সমালোচনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এটি পার্টির বিদেশি নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে পারে এবং বাংলাদেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফেলতে পারে। তবে, দেশের অভ্যন্তরে এই ধরনের রেটোরিকের প্রভাব এখনও অনিশ্চিত, কারণ রাজনৈতিক সমতা ও সংবিধানিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখনো একটি জটিল প্রক্রিয়া।



