ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার সাম্প্রতিক আক্রমণের ফলে কিয়েভের বহু বহুতল ভবনে তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জরুরি সহায়তা হিসেবে ৪৪৭টি জেনারেটর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সরঞ্জামগুলো শীতের তীব্রতায় শহরের হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্যান্য জরুরি সেবায় বিদ্যুৎ পুনরায় চালু করতে ব্যবহৃত হবে। শীতকালে ইউক্রেনের তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, যা মানবিক সংকটকে তীব্র করে তুলেছে।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক রকেট ও ড্রোন হামলায় কিয়েভের প্রায় চার হাজার বহুতল ভবনে তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, একই সঙ্গে শহরের বেশিরভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়। এই পরিস্থিতিতে গৃহস্থালির তাপ ও আলো ছাড়া শীতকাল কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে বয়স্ক ও রোগীসহ দুর্বল গোষ্ঠীর জন্য। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি সহায়তা পরিকল্পনা এই ঘাটতি পূরণে লক্ষ্য রাখে।
ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে যে রাশিয়ার অবিরাম আক্রমণের ফলে এক মিলিয়নের বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিক শীতের তীব্রতায় বিদ্যুৎ, পানি ও তাপের অভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য। এই মানবিক জরুরি অবস্থার মোকাবিলায় কমিশন ৪৪৭টি জেনারেটর দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৩.৭ মিলিয়ন ইউরো। এই জেনারেটরগুলো বিশেষভাবে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্যান্য জরুরি সেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যবহার হবে।
ইইউয়ের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাজা লাহবিব উল্লেখ করেছেন যে রাশিয়ার সরাসরি আক্রমণ ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, ফলে নাগরিকদের মৌলিক সেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই জেনারেটরগুলো শীতের কঠিন সময়ে জীবনরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। লাহবিবের মতে, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ব্রাসেলসের তথ্য অনুযায়ী, এই ৪৪৭টি জেনারেটর ইতিমধ্যে ইউক্রেনে পাঠানো ৯,৫০০টি ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা মোট জেনারেটর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। পূর্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন ধরণের জেনারেটর ও জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেনকে সমর্থন করেছে, এবং এই নতুন শিপমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় এলাকায় পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি দেশের জ্বালানি খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে উল্লেখ করেছেন যে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার ফলে কিয়েভের বহু বাসিন্দা এখনও তাপ ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবনযাপন করছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত সহায়তা চেয়েছেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই পদক্ষেপকে প্রশংসা করেছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সহায়তা কেবল মানবিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাশিয়ার আক্রমণবিরোধী কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ইউরোপীয় সংস্থা পূর্ব ইউরোপে শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাশিয়ার প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করতে এই ধরণের সরঞ্জাম সরবরাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অতিরিক্ত জেনারেটর, জ্বালানি সঞ্চয় এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ধরণের তাত্ক্ষণিক সহায়তা রাশিয়ার আক্রমণকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। তারা আরও উল্লেখ করেন যে ইউরোপীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারে, যাতে শীতকালে বিদ্যুৎ ঘাটতি কমে।
সারসংক্ষেপে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৪৪৭টি জেনারেটর পাঠানোর সিদ্ধান্ত শীতের কঠিন সময়ে ইউক্রেনের মানবিক সংকট লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থনের একটি স্পষ্ট সংকেত, এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত জ্বালানি সহায়তার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। ইউক্রেনের সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা শীতের তীব্রতায় নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



