বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, ৫ ফেব্রুয়ারি নতুন স্টার্ট (নিউ স্টার্ট) চুক্তির মেয়াদ শেষের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭২ সালে রিচার্ড নিক্সন ও লিওনিড ব্রেজনেভের স্বাক্ষরে শুরু হওয়া এই দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে ৯০ শতাংশেরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের সীমা নির্ধারণ করেছিল। তবে আজ চুক্তি নবায়নের বিষয়ে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না, ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর শেষের দিকে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিউ স্টার্ট চুক্তি নবায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো বিশেষ যোগাযোগ নেই। এই অবস্থান রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ ও সীমাবদ্ধতা বজায় রাখতে চুক্তির গুরুত্বকে তুলে ধরে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, চুক্তি শেষ হলে নতুন কোনো উন্নত পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করা হবে, তবে তা কখন এবং কীভাবে হবে তা এখনো অনির্ধারিত।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দশকের পর দশক গড়ে তোলা পারমাণবিক নিরাপত্তা কাঠামোকে অগ্রাহ্য করা বৃহত্তর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হলে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছতা হ্রাস পাবে, যা ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।
মস্কোর পক্ষ থেকে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশের পরেও ওয়াশিংটন থেকে ইতিবাচক সাড়া এখনও পাওয়া যায়নি। প্রেসিডেন্ট পুতিন ২০২৭ সাল পর্যন্ত বর্তমান সীমাবদ্ধতা মেনে চলার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখিয়েছেন, তবে ইউক্রেনের চলমান সংঘাতের কারণে দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক গভীরতর হয়েছে।
ইতিহাসে কিউবান মিসাইল সংকটের পর দুই পরাশক্তি পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছিল। সেই সময় গৃহীত নিয়মাবলীই নিউ স্টার্টের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল, যা পরবর্তীতে বহু পর্যালোচনা ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বর্তমান রূপ পেয়েছে।
ট্রাম্পের শাসনকালে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের পর রাশিয়া চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা কমে গিয়েছে; মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন ও তথ্য বিনিময় এখন কার্যকর নয়।
একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান পারমাণবিক রাজনীতি পূর্বের তুলনায় জটিলতায় পরিপূর্ণ। পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা একসাথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যা ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের স্নায়ুযুদ্ধের তীব্রতা আজকের প্রজন্মের কাছে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা কঠিন। তবে পারমাণবিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর পুনর্গঠন অপরিহার্য, নতুবা অনিরাপদ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই নতুন কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারে, অথবা বর্তমান সীমাবদ্ধতা বজায় রাখার জন্য পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তুলতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা আলোচনার সূচনা দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক স্বচ্ছতা পুনরুদ্ধার করতে ইউরোপীয় দেশগুলো, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে পারে। তবে তাদের সাফল্য নির্ভর করবে প্রধান দুই শক্তির রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও কূটনৈতিক নমনীয়তার উপর।
সারসংক্ষেপে, নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন সমঝোতার সম্ভাবনা অনিশ্চিত, এবং বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এই অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে। ভবিষ্যতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক গতি-প্রকৃতি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের গতি।



