যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বিটজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক অনুষ্ঠানে গাজা উপত্যকার জন্য একটি বিশাল পুনর্গঠন প্রকল্প উপস্থাপন করেন। এই উদ্যোগটি নতুন “বোর্ড অফ পিস”ের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মাধ্যমে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। পরিকল্পনাটি গাজাকে তিনটি প্রধান বিভাগে ভাগ করে সম্পূর্ণ নগর পরিকল্পনা, কৃষি ও শিল্পের সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য রাখে।
প্রদর্শিত স্লাইডে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল বরাবর উচ্চমানের আকাশচুম্বী ভবন এবং রাফাহ অঞ্চলে বিশাল আবাসিক প্রকল্পের চিত্র দেখা যায়। পরিকল্পনা অনুসারে গাজার সমগ্র ভূখণ্ডে আধুনিক বাসস্থান, কৃষি ক্ষেত্র এবং শিল্প পার্ক স্থাপন করা হবে, যার মধ্যে এক লাখেরও বেশি স্থায়ী বাড়ি, দুইশোটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পঁচাত্তরটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারিত।
ট্রাম্প গাজার ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রতীরবর্তী জমির সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি গাজার সম্ভাব্য পর্যটন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তরের কথা উল্লেখ করে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
কুশনারের মতে, গত দুই বছরে গাজার যুদ্ধের ফলে প্রায় ছয় কোটি টন ধ্বংসাবশেষ জমা হয়েছে, যা দ্রুত অপসারণের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। রাফাহ শহরকে কেন্দ্র করে প্রথম ধাপের কাজ শুরু হবে, যেখানে এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসিক ইউনিট, দুইশোটি স্কুল ও পঁচাত্তরটি চিকিৎসা কেন্দ্রের নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে “নিউ রাফাহ” নামে একটি আধুনিক নগরী গড়ে উঠবে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮০টি উচ্চ টাওয়ার সমন্বিত পর্যটন কেন্দ্র, একটি নতুন সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের প্রস্তাবও করা হয়েছে। এই অবকাঠামো গাজাকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্য প্রকাশ পায়।
তবে এই বিশাল প্রকল্পের বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে হোয়াইট হাউস হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ দাবি করে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, হামাস অস্ত্র ত্যাগ না করলে তাদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলা হবে। এই শর্তটি গাজার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হার্জগ ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রশংসা করেন, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন গাজা থেকে হামাসকে সম্পূর্ণভাবে দূর করা প্রকল্পের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। হার্জগের মতে, গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো পুনর্গঠন কাজ টেকসই হবে না।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সম্পূর্ণ শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি গাজা প্রশাসনে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। তিনি যুক্তি দেন, গাজার পুনর্গঠন প্রকল্পে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি ছাড়া কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পরিকল্পনা মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। কিছু দেশ গাজার পুনর্গঠনকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাগত জানায়, অন্যদিকে কিছু দেশ শর্তসাপেক্ষে সমর্থন প্রকাশ করে, বিশেষত হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন গাজার অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন জটিলতা যোগ করবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। গাজার পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে সমন্বয় না হলে প্রকল্পটি বাধার সম্মুখীন হতে পারে।
পরবর্তী ধাপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গাজার ধ্বংসাবশেষ অপসারণের কাজ ত্বরান্বিত করতে এবং রাফাহে প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ কাজ শুরু করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউস হামাসের নিরস্ত্রীকরণে অগ্রগতি না হলে পরিকল্পনা স্থগিত করার সম্ভাবনা উল্লেখ করেছে। এই শর্ত পূরণ হলে গাজার নতুন নগরী, বন্দর ও বিমানবন্দর নির্মাণের সময়সূচি অনুসারে কাজ এগিয়ে যাবে।
গাজার ভবিষ্যৎ গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং গাজার বাসিন্দাদের স্বার্থকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। এই পরিকল্পনা গাজার দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে, তবে তা অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি অপরিহার্য।



