গত সপ্তাহে ডেনমার্কের সরকার গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সেনাবাহিনীর উচ্চ সতর্কতা আরোপের নির্দেশ দিয়েছে। এতে ড্যানিশ সৈন্যদের গুলিবিদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা এবং প্রয়োজন হলে রাজধানী নুকে তাজা গুলি ব্যবহার করার অনুমতি অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ডিআরের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ড্যানিশ সামরিক বাহিনীর সব ইউনিটকে তীব্র পর্যবেক্ষণের অধীনে রাখা হবে এবং গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত স্থানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করা হবে। বিশেষ করে নুক শহরের চারপাশে অতিরিক্ত অস্ত্রশস্ত্র ও লজিস্টিক সাপোর্ট স্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ডেনমার্কের রাজনৈতিক পরিসরে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক সমর্থন পায়। শাসন জোটের পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দলগুলোও গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক প্রতিরোধের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। পার্লামেন্টে একাধিকবার এই বিষয়ে আলোচনা হয় এবং কোনো রাজনৈতিক দলই এই উচ্চ সতর্কতা বাতিলের পক্ষে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের গ্রিনল্যান্ডের ওপর কৌশলগত আগ্রহের প্রেক্ষাপটে ডেনমার্কের এই পদক্ষেপকে প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ এবং উত্তর আটলান্টিকের কৌশলগত অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এই প্রেক্ষিতে ডেনমার্কের উচ্চ সতর্কতা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হুমকির মুখে দ্বীপের স্বনির্ভরতা রক্ষার উদ্দেশ্য প্রকাশ করে।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ শুরুর থেকেই দ্বীপের বিক্রয় বা কোনো বিদেশি শাসন গ্রহণের কোনো প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ডেনিশ সার্বভৌমত্বের পুনঃপ্রতিপাদন করে এবং গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্কের অখণ্ড অংশ হিসেবে বজায় রাখার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃত এবং পূর্বে কোনো বিক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।
অঞ্চলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়েছে। উভয় দেশই উত্তর আটলান্টিকের সামুদ্রিক রুট এবং শীতল জলবায়ু সম্পদে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা ডেনমার্কের নিরাপত্তা নীতিকে জটিল করে তুলেছে। তাই ডেনমার্কের উচ্চ সতর্কতা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হুমকি নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিক্রিয়া হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
একজন কূটনীতিকের মতে, ডেনমার্কের এই পদক্ষেপ NATO-র সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিপ্লোম্যাটিক সংলাপ এবং বহুপাক্ষিক চুক্তি প্রয়োজন হবে।
পরবর্তী কয়েক মাসে ডেনমার্কের সরকার গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করবে এবং NATO‑র সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য সামরিক ব্যায়াম আয়োজনের সম্ভাবনা বিবেচনা করবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো উত্তেজনা হ্রাসের উপায় অনুসন্ধান করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ডেনমার্কের সামরিক উচ্চ সতর্কতা গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন গতিবিধি দেখা যাবে এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনার দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে।



