ঢাকার ফ্যাকাল্টি অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফডিসি) এ শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর রওনক জাহান, জুলাই ২০২৪ উত্থানের পরের দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, উত্থানের আগে দেশের জননিরাপত্তা প্রধানত রাষ্ট্রের দমনমূলক নীতি থেকে ভয়ের স্রোত তৈরি করত, আর এখন সামাজিক মিডিয়া ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর কার্যক্রম থেকে অতিরিক্ত অসহিষ্ণুতা দেখা দিচ্ছে।
প্রফেসর জাহান, যিনি সিপিডির সম্মানিত ফেলো এবং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত, তার বক্তব্যে জোর দেন যে বর্তমান ভয়ের উৎস একক নয়; তা রাষ্ট্রের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকেও উদ্ভূত হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক নাগরিক এখন ভয়ের মূল কারণ চিহ্নিত করতে পারছেন না, যা সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
বৈধ প্রশ্ন তোলার অধিকারকে তিনি গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন, তবে তা সহিংসতা বা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। তিনি দেশকে আরও সহনশীল হতে আহ্বান জানান, যাতে সঠিক পথে না চললে প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু প্রশ্নের অর্থ হয় না যে কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করা।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে জনমত গঠনে ভয় ও সহিংসতার সম্ভাবনা বাড়ার কথা তিনি উল্লেখ করে, রাজনৈতিক দলগুলোকে অধিক দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের মূল প্রতিযোগিতা হল নির্বাচনে একটি দল জয়ী হয়, অন্যটি পরাজিত হয়; তবে এখনো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরাজয়ের স্বীকৃতি গড়ে ওঠেনি।
প্রফেসর জাহান অতীতে দেখা গেছে, যারা নির্বাচনে হারে তারা ফলাফলকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখায়, তা আবার বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি এই ধরণের মনোভাবকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তা রোধে সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
বিতর্কের অংশ হিসেবে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা ‘আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে’ শিরোনামে সমর্থনমূলক মতামত উপস্থাপন করেন। তারা যুক্তি দেন, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দৃঢ় করবে এবং অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র ভোটের আয়োজনই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করতে পারে না; দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আইনি ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা প্রস্তাব করেন, নির্বাচনের আগে ও পরে শক্তিশালী তদারকি ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাস্তবিক গণতন্ত্রের রক্ষার মূল চাবিকাঠি।
প্রফেসর জাহান এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে ভোটের প্রক্রিয়া ও ফলাফল উভয়ই জনগণের আস্থা অর্জন করে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি নির্বাচনের ফলাফল স্বচ্ছভাবে গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
উল্লেখযোগ্য যে, জুলাই ২০২৪ উত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ শাসনের কর্তৃত্ববাদী রূপান্তর শেষ হয়ে যায় এবং দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন গতিপথ গড়ে ওঠে। প্রফেসর জাহান এই পরিবর্তনকে ‘মব’ (মোব) হিসেবে উল্লেখ করেন, যা বর্তমান আলোচনার একটি নতুন উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি শেষ করে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি সকলকে আহ্বান জানান, ভয়কে দমন না করে, সহনশীলতা ও গঠনমূলক প্রশ্নের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে একসাথে কাজ করতে।



