বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য প্রস্থানকারী শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি চালু রয়েছে, যা রাজনৈতিক সংযোগযুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে এবং শ্রমিকদেরকে ঋণ, শোষণ ও জোরপূর্বক কাজের চক্রে আটকে রাখে। এই বিষয়টি ২৩ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি কয়েক মাসের গভীর অনুসন্ধান এবং একশের বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যার মধ্যে বর্তমান ও প্রাক্তন সরকারী কর্মকর্তা, শ্রম বিশ্লেষক, নিয়োগ এজেন্ট এবং বাংলাদেশি মাইগ্র্যান্ট অন্তর্ভুক্ত। তারা সকলেই একই রকম অভিযোগ তুলে ধরেছেন যে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফি সংগ্রহের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে, প্রায়শই এমন চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যা বাস্তবে অস্তিত্বহীন।
বহু শ্রমিকের বর্ণনা অনুসারে, নিয়োগ সংস্থা প্রাথমিক আবেদন ফি, প্রশিক্ষণ ফি, ভিসা ফি এবং অন্যান্য গোপন চার্জের মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে দেয়। এই ফি গুলো প্রায়শই হাজার হাজার ডলারের সমান, যা অধিকাংশ শ্রমিকের জন্য ঋণগ্রস্ত অবস্থার সৃষ্টি করে। ফি পরিশোধের জন্য শ্রমিকরা প্রায়শই ঋণ নিতে বাধ্য হন, যার সুদ দৈনিকভাবে বাড়তে থাকে, ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক দাসত্বে আটকে যায়।
একটি স্পষ্ট উদাহরণ হল শফিকুল ইসলাম নামের একজন বাংলাদেশি মাইগ্র্যান্ট, যিনি মালয়েশিয়ার নির্মাণ কাজের জন্য $৪,৪০০ ঋণ নিয়ে ভ্রমণ করেন। কাজের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, তিনি কুয়ালালামপুরের প্রান্তে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে আটকে থাকেন, যেখানে তার নিয়োগকর্তা অদৃশ্য হয়ে যায়। ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর তার ঋণ সুদে বাড়তে থাকে এবং তিনি কোনো কাজের সুযোগ পান না।
ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ শফিকুলের স্বাস্থ্য অবনতি ঘটে, এবং ডরমিটরিতে কনভালশন (মাসল স্পাজম) হওয়ার পর তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে শারীরিক ক্লান্তি এবং আর্থিক চাপের ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপ উল্লেখ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রাক্তন অ্যান্টি-করাপশন কমিশন প্রধানের মতে, শফিকুলের মৃত্যু মানব পাচারের স্পষ্ট উদাহরণ এবং দেশের শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্নীতির ফলাফল। তিনি উল্লেখ করেন যে এই ধরনের ঘটনা সিস্টেমিক দুর্নীতির চরম পরিণতি।
গত দশকে ৮ লক্ষেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজের সন্ধানে গেছেন, এবং তাদের নিয়োগ ফি অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই ফি গুলো কেবল আর্থিক দায়িত্ব বাড়ায় না, বরং শ্রমিকদেরকে বাধ্যতামূলক শ্রম ও মানব পাচারের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
তদন্তে দেখা যায়, উচ্চ ফি সংগ্রহের ফলে শ্রমিকরা প্রায়শই ঋণদাসত্বে পড়ে, যা তাদেরকে জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করে। কিছু ক্ষেত্রে, এই শোষণ ব্যবস্থা মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শ্রমিকদেরকে অবৈধভাবে স্থানান্তরিত করে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ।
মালয়েশিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মহাতির মোহাম্মদও এই সমস্যার বহুস্তরীয় প্রকৃতি উল্লেখ করে বলেছেন যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরণের ব্যক্তি ও সংস্থা যুক্ত রয়েছে, এবং সিস্টেমের সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তিনি পূর্বে এই ক্ষেত্রের সংস্কারের জন্য পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তবে বাস্তবায়নে অগ্রগতি সীমিত রয়ে গেছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে মালয়েশিয়ার শাসক এলিটের কিছু ব্যক্তিরা এই দুর্নীতিকর প্রথা সম্পর্কে জানতেন, তবু তারা ফি থেকে প্রাপ্ত লাভের কারণে কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন। এই স্বার্থপরতা পুরো নিয়োগ চেইনকে রক্ষা করে, ফলে শ্রমিকদের কষ্ট অব্যাহত থাকে।
এই পরিস্থিতি কেবল দুই দেশের শ্রমিক বাজারের মধ্যে নয়, বরং আন্তর্জাতিক শ্রম নীতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায়ও প্রভাব ফেলছে। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ উভয় সরকারই এই সমস্যার সমাধানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে, তবে বাস্তবিক পদক্ষেপের অভাব এখনও বিদ্যমান। ভবিষ্যতে নিয়োগ ফি নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষামূলক আইনি কাঠামো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য যৌথ উদ্যোগের আহ্বান করা হচ্ছে, যাতে শ্রমিকদের আর আর্থিক ও শারীরিক শোষণের শিকার হতে না হয়।



