যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি ২২ জানুয়ারি ও ২০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে যথাক্রমে বাংলাদেশে নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা জারি করেছে। উভয় দেশের পরামর্শে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে তিনটি নির্দিষ্ট জেলার (সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা) ভ্রমণ এড়িয়ে চলা উচিত। এই পদক্ষেপের পেছনে সন্ত্রাসী হামলা, আইনশৃঙ্খলা অবনতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা রয়েছে।
FCDO-এর নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনী প্রচারণা ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই সময়ে আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করতে পারে এবং বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। তাই সরকারি ও বেসরকারি ভবন, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, গণপরিবহন, জনাকীর্ণ স্থান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং রাজনৈতিক সমাবেশস্থলগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকা জেলাগুলোকে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এই অঞ্চলগুলোতে পূর্বে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের রেকর্ড রয়েছে এবং নির্বাচনী সময়ে রাজনৈতিক সমাবেশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। FCDO উল্লেখ করেছে যে, এই ঝুঁকিগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটতে পারে এবং কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই ঘটতে পারে।
গত জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে বর্তমান পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকরা বলেন, ঐ সময়ের বিশৃঙ্খলা এখনো সম্পূর্ণভাবে সেরে ওঠেনি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়মিত সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভের সম্ভাবনা এখনও বিদ্যমান।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরিতে একই ধরনের সতর্কতা প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও কোনো স্তর পরিবর্তন করা হয়নি। এতে অপহরণ, অস্থিরতা, অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ভ্রমণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। অ্যাডভাইজরিতে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ফলে কিছু মাত্রায় সহিংসতা কমলেও বিক্ষোভের ঝুঁকি রয়ে গেছে, যা হঠাৎ সহিংস রূপ নিতে পারে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “দুইটি প্রধান পশ্চিমা দেশের একই সময়ে সতর্কতা জারি করা দেশীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের তীব্রতা নির্দেশ করে এবং বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য ঝুঁকি মূল্যায়নকে কঠোর করে তুলবে।” তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্ধারিত নির্বাচনকে নিশ্চিত করেছে, তবে বর্তমান নিরাপত্তা পরিবেশের অস্থিরতা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর সমাবেশ, র্যালি ও বিক্ষোভের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে, একই সময়ে অন্যান্য দেশেরও নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করার প্রবণতা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু আফ্রিকান দেশে নির্বাচনের আগে বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমন্বয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে দেশীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে নির্বাচনী সময়ে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জনসাধারণের বড় জমায়েতের নিকটে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত গার্ড ও নজরদারি বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভ্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নির্ধারিত তিনটি জেলার ভ্রমণ এড়িয়ে চলা এবং বড় জনসমাগমের স্থানগুলোতে উপস্থিতি সীমিত রাখা। এছাড়া, স্থানীয় সংবাদ ও সরকারি নির্দেশনা নিয়মিত অনুসরণ করা এবং জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, যদি কোনো ভ্রমণ অপরিহার্য হয়, তবে নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে রুট পরিকল্পনা করা এবং স্থানীয় গাইডের সহায়তা নেওয়া উচিত। এছাড়া, ভ্রমণ বীমা এবং জরুরি প্রস্থান পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
উভয় দেশের পরামর্শের ভিত্তিতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থা এবং ভ্রমণ এজেন্সিগুলোও তাদের গ্রাহকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে এবং বিকল্প গন্তব্যের সুপারিশ করছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে এই সতর্কতা পুনর্বিবেচনা করা হবে, তবে বর্তমান সময়ে ভ্রমণকারীদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন।



