যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (HHS) ও পররাষ্ট্র দপ্তর বৃহস্পতিবার একত্রে জানায় যে দেশটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে। এই পদক্ষেপটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এক বছরের পুরোনো নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নীতি পুনর্গঠনের সংকেত দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত আদেশের এক বছর পর দেশটি WHO‑এর সদস্যপদ থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করেছে। এই সিদ্ধান্তের আগে ট্রাম্প প্রশাসন বহুবার WHO‑এর কার্যক্রমকে সমালোচনা করেছিল, বিশেষত কোভিড‑১৯ মহামারীর সময়ে সংস্থার ভূমিকা নিয়ে।
HHS ও পররাষ্ট্র দপ্তরের যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, WHO‑এর মূল মিশন থেকে বিচ্যুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষার প্রশ্নে সংস্থার কাজকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী হিসেবে দেখা হয়েছে। উভয় মন্ত্রণালয় একসঙ্গে এই পদক্ষেপের কারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেছে।
একজন জ্যেষ্ঠ HHS কর্মকর্তা বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের মৌলিক লক্ষ্য থেকে সরে গেছে এবং একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষার প্রশ্নে আমাদের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করেছে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।
কোভিড‑১৯ মহামারীর সময়ে WHO‑এর ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা তীব্র ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, সংস্থা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে দেরি করেছে, ফলে মহামারীর বিস্তার দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এছাড়া, মহামারীর শুরুর দিকে কিছু দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ বন্ধের সিদ্ধান্তের পর WHO‑এর সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অন্যান্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অন্য একটি অভিযোগে বলা হয়, WHO‑এর অর্থনৈতিক অবদান চীনের তুলনায় কম, তবু সংস্থার শীর্ষ পদে কখনোই কোনো মার্কিন নাগরিককে নিযুক্ত করা হয়নি। এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য শাসনে প্রতিনিধিত্বের অভাবের ইঙ্গিত হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই প্রত্যাহারকে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে। ইনফেকশাস ডিজিজেস সোসাইটি অব আমেরিকার (IDSA) প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড নাহাস বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটি ভুল এবং দূরদর্শিতার অভাবের ফল।” তিনি যুক্তি দেন, “রোগের সীমানা নেই, তাই আমাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময় অপরিহার্য।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, WHO‑এর সদস্যপদ ত্যাগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা ও ভ্যাকসিন শেয়ারিং নেটওয়ার্কে প্রবেশ সীমিত হতে পারে। তারা আরও উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইতে একতাবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো দেশ একা সফল হতে পারবে না।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের বহুপাক্ষিক সংস্থার প্রতি মনোভাবের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। পররাষ্ট্র দপ্তর সম্ভবত নতুন দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক স্বাস্থ্য চুক্তি গড়ে তুলতে পারে, তবে তা WHO‑এর সমন্বিত কাঠামোর তুলনায় সীমিত হতে পারে।
পরবর্তী ধাপে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার WHO‑এর সঙ্গে চলমান প্রকল্প ও চুক্তিগুলোর সমাপ্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য নীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন কাঠামো উপস্থাপন করবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোরদার হয়েছে।



