বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২২ সালের শেষের দিকে তীব্র চাপের মুখে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ প্রায় $২০ বিলিয়নের নিচে নেমে আসে, যখন এক বছর আগে তা $৪০ বিলিয়নের উপরে ছিল। একই সময়ে আমদানি বিল বৃদ্ধি পায়, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্সের গতি ধীর হয়ে যায়, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা বিনিময় হারের নমনীয়তা সীমাবদ্ধ করে। ফলস্বরূপ মুদ্রাস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছে এবং জিডিপি বৃদ্ধির হার হ্রাস পায়।
এই আর্থিক সংকটের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ইএমএফ) ২০২৩ জানুয়ারিতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ৪২ মাসের ঋণ প্যাকেজ অনুমোদন করে। পরবর্তীতে প্যাকেজটি ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের সম্প্রসারণ করা হয়। ঋণ প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হল পেমেন্ট ব্যালান্স স্থিতিশীল করা এবং আর্থিক, মুদ্রা ও ব্যাংকিং ক্ষেত্রের সংস্কারকে ত্বরান্বিত করা। তবে নির্বাচনের পর পর্যন্ত এই তহবিলের বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইএমএফের সহায়তা শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি প্রোগ্রাম পূর্বাভাসের তুলনায় কমে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক বাধা এবং আর্থিক শর্তের কঠোরতা ইএমএফ কর্মীদের ধারাবাহিকভাবে পূর্বাভাস হ্রাসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবুও ২০২৫ সালে বহিরাগত ব্যালান্সে উন্নতি দেখা যায়, যা প্রোগ্রামের আর্থিক সহায়তা এবং অন্যান্য বড় ঋণদাতার বাজেট সমর্থনের সমন্বয়ে সম্ভব হয়েছে।
প্রোগ্রামের একটি মূল দিক হল মুদ্রা বিনিময় হারের নমনীয়তা বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কুয়াসি-ফিস্কাল ও প্রশাসনিক বিকৃতি হ্রাস করা। এর মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপ কমিয়ে হারের সমন্বয় সাধন এবং বাজার উপকরণ ব্যবহার করে তরলতা বৃদ্ধি করা লক্ষ্য। ২০২৫ সালের ইএমএফ কর্মী পর্যালোচনায় ট্রাঞ্চ মুক্তি হারের নমনীয়তা ও স্বচ্ছতার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
ইএমএফের শর্ত অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের রিপোর্টিং পদ্ধতি পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মান BPM6 অনুযায়ী প্রকাশ করতে শুরু করে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং সিস্টেমে সমস্যাযুক্ত সম্পদের তথ্যও প্রকাশ করা হয়, যা পূর্বে গোপন ছিল। এই স্বচ্ছতা আর্থিক সেক্টরের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোও প্রোগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সামাজিক ও অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ রক্ষার জন্য কর রাজস্ব বৃদ্ধি প্রয়োজন, বিশেষ করে বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ভর্তুকি হ্রাসের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় করের ছাড় ধীরে ধীরে বাতিল, ভ্যাটের অনুসরণ বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত।
প্রোগ্রাম অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাতকে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া পরিকল্পনা ছিল, তবে এখন পর্যন্ত এই লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবুও ধারাবাহিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ইচ্ছা স্পষ্ট।
বাজারে এই সংস্কারগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। মুদ্রা হারের নমনীয়তা বাড়ার ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। একই সঙ্গে, রিজার্ভের স্বচ্ছতা বাড়ার ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার হতে পারে।
অন্যদিকে, ভর্তুকি হ্রাসের ফলে বিদ্যুৎ খরচে বৃদ্ধি হতে পারে, যা ভোক্তা ও শিল্পখাতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে সরকার এই চাপ কমাতে ধাপে ধাপে রিফান্ড বা বিকল্প সহায়তা পরিকল্পনা বিবেচনা করছে।
ইএমএফের আর্থিক সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো দেশের আর্থিক কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পরিবেশের অনিশ্চয়তা এই প্রক্রিয়ার গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আসন্ন নির্বাচনের পর যদি প্রোগ্রামের তহবিল পুনরায় মুক্তি পায়, তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা আরও দৃঢ় হতে পারে। তবে তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, ইএমএফের সহায়তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তাত্ক্ষণিক সংকট থেকে বের করে আনতে সহায়তা করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মুদ্রা হারের নমনীয়তা, কর রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি সংস্কারসহ বহু দিকের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে মূল ঝুঁকি হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা এবং বাণিজ্যিক বাধা উল্লেখযোগ্য। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতি ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার সমর্থন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।



