ঢাকা, ২২ জানুয়ারি – অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যাংকিং খাতের বর্তমান গভীর কাঠামোগত সমস্যার সমাধান স্বল্পমেয়াদে, অর্থাৎ এক থেকে এক বছর চার মাসের মধ্যে সম্ভব নয় বলে সতর্ক করেছেন। তিনি এই মন্তব্য একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকিং খাতের সংস্কার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জানিয়েছেন।
ড. আহমেদ উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রক অনিয়মের ফলে ব্যাংকিং সেক্টরের সুদৃঢ় সংস্কার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া বাস্তবায়ন করা কঠিন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই খাতের পুনর্গঠন স্বল্পমেয়াদে সম্পন্ন করা বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপ্রাসঙ্গিক।
বৈঠকে তিনি ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জের মাত্রা তুলে ধরেন এবং বললেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে। তাই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ড. আহমেদ স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বায়ত্তশাসন থাকা জরুরি, তবে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা জবাবদিহি ছাড়া বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপরে কাজ করতে পারে না।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের আলোকে তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে অর্থ পাচার, বাণিজ্য সংক্রান্ত অপরাধ এবং মুদ্রাস্ফীতি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব বিষয় সরাসরি ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে।
ড. আহমেদ বলেন, এই ঝুঁকিগুলো মোকাবেলায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নীতি নির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজই সমস্যার মূল সমাধান হতে পারে।
অডিট ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বেশ কিছু চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্ম যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অডিট রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছে, যা আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য হুমকি স্বরূপ।
ড. আহমেদ জানান, অডিটের ঘাটতি শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; উচ্চশিক্ষা সহ অন্যান্য সেক্টরের বড় আর্থিক লেনদেনেও যথাযথ অডিটের অভাব দেখা যাচ্ছে। এই অবস্থা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
আইনি সংস্কারের দিক থেকে তিনি সরকারী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ও হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন অ্যাক্টের সাম্প্রতিক সংশোধনের পাশাপাশি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধন কাজ চলছে।
তবে ড. আহমেদ সময়ের সীমাবদ্ধতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়ার জন্য সময়ের ঘাটতি একটি গুরুতর বাধা, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন দাবি করে।
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং কাঠামোর অংশ হিসেবে অতিরিক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংখ্যা যৌক্তিক স্তরে আনতে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো সংস্থার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ড. আহমেদ আশাবাদী যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের আর্থিক সুনাম এখনও ইতিবাচক রয়ে গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সঠিক নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন হলে দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।
সংক্ষেপে, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যাংকিং সেক্টরের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির সমন্বয়, অডিটের মানোন্নয়ন এবং আইনগত কাঠামোর দ্রুত সংশোধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি সময়ের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে, তবু সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।



