ব্রাসেলসের ইইউ শীর্ষ সম্মেলনের পর, ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি অ্যান্টোনিও কোস্টা ট্রাম্পের নতুন গঠন করা “বোর্ড অব পিস”‑এর কার্যপ্রণালী ও লক্ষ্য সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বোর্ডের চার্টারে থাকা কিছু ধারা আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে জাতিসংঘের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা স্পষ্ট নয়।
কোস্টা বলেন, বোর্ডের শাসন কাঠামো, কাজের পরিধি এবং জাতিসংঘের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্নে ইইউ বহু দিক থেকে সন্দেহ পোষণ করে। তবুও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গাজা অঞ্চলের ব্যাপক শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করেছেন, যেখানে বোর্ডকে অস্থায়ী প্রশাসনিক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত এই সংস্থার স্থায়ী সদস্যপদে এক বিলিয়ন ডলার ফি নির্ধারিত হয়েছে। যদিও মূলত গাজা পুনর্নির্মাণ তত্ত্বাবধানের জন্য পরিকল্পিত ছিল, তবে চার্টারের ভাষা থেকে বোঝা যায় যে এর কার্যক্রমকে শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি এবং এটি জাতিসংঘের ভূমিকার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্মেলনের পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে জানান, তার দেশ বোর্ডের অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্পেনের এই সিদ্ধান্ত বোর্ডের কাঠামো ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাড়তে থাকা সন্দেহের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প এই নতুন সংস্থার উদ্বোধন ড্যাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে করেছেন, যেখানে ১৯টি দেশের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই অনুষ্ঠানে বোর্ডের গ্লোবাল শান্তি রক্ষার লক্ষ্য তুলে ধরা হয়, তবে এর বাস্তবিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোও বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বোর্ডের সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যেহেতু রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।
ফ্রান্স সরকার চার্টারের বর্তমান রূপকে তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি, বিশেষ করে জাতিসংঘের সদস্যপদে থাকা বাধ্যবাধকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। ফরাসি কর্মকর্তারা বোর্ডের কাঠামো ও লক্ষ্যকে পুনর্বিবেচনা না করা পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গাজা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে, বোর্ডের ভূমিকা কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে তা এখনো অনিশ্চিত। কোস্টা ইইউকে গাজা পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা প্রদান করার সময় বোর্ডের অস্থায়ী প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে এর জন্য স্পষ্ট শর্ত ও সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে: কীভাবে একটি নতুন গ্লোবাল শান্তি সংস্থাকে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, এবং একইসঙ্গে জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা বজায় রাখা যায়। বোর্ডের উচ্চ ফি ও বিস্তৃত ক্ষমতা কিছু দেশকে সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে, যা ভবিষ্যতে তার কার্যকারিতা ও স্বীকৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ইইউ শীর্ষ সম্মেলন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গাজা পরিকল্পনা সংক্রান্ত আলোচনার সময় বোর্ডের চূড়ান্ত শর্তাবলী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি ইইউ এবং অন্যান্য প্রধান মিত্র দেশগুলো বোর্ডের শাসন ও লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্ট সমঝোতা না করে, তবে এই সংস্থার আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্রহণযোগ্যতা সীমিত থাকতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস গ্লোবাল শান্তি রক্ষার নতুন মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এর চার্টারের সামঞ্জস্য, আর্থিক শর্ত এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ইউরোপীয় নেতৃত্বের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বোর্ডের ভূমিকা ও সীমা নির্ধারণে পারস্পরিক সমঝোতা অর্জন করা এখনো বাকি।



