ঢাকার পল্টন থানা প্রাঙ্গণে বৃহস্পতিবার দুপুরে এক চার বছর বয়সী শিশুর মা পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে শিশুর স্কুলে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বিস্তারিত জানান। মা জানান, শিশুটি এখনও আঘাতের শোকে ভুগছে; ঘুমের মাঝেও “মুখ সিলি করে দিও না” বলে চিৎকার করে, আর “স্কুলে আর যাব না” বলে অশান্তি প্রকাশ করছে।
মা ও বাবার উদ্বেগের ফলে শিশুটি বাড়িতে ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুর শারীরিক অবস্থা খারাপ, ত্বকে চেপে থাকা রক্তের দাগ এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যায়। মা জানান, শিশুর চঞ্চল ও জেদি স্বভাবের কারণে বাবা সাধারণত ছুটির দিনে তাকে স্কুল থেকে আনেন, তবে ওই দিন মা নিজেই গিয়ে শিশুটিকে নিয়ে এসেছেন।
পুলিশের মতে, শিশুর পোশাক কোঁচকানো, একটি জুতা খুলে এবং চুল এলোমেলো ছিল, যা শিশুর মানসিক অশান্তি ও শারীরিক কষ্টের স্পষ্ট চিহ্ন। শিশুর অবস্থা দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা জানালেন, শিশুটি সাধারণত সক্রিয় ও উচ্ছল, তবে এই ঘটনার পর তার মনোভাব সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে।
শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার সময়, প্রধান শিক্ষক স্বীকার করেন যে শিশুটি তার গায়ে লাথি মারেছে এবং মুখে থুতু দিয়েছে। ঘটনাটির পর শিক্ষক শিশুটিকে হালকা করে চড়িয়ে দেন, যা পরে অতিরিক্ত শারীরিক নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষক দাবি করেন, তিনি শিশুটিকে শৃঙ্খলায় আনতে চেয়েছিলেন, তবে তার পদ্ধতি অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিল।
শিশুর মা ও বাবা, পাশাপাশি অন্যান্য অভিভাবকরা স্কুলের সামনে সমাবেশ করে গর্জে ওঠেন। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে তীব্র অভিযোগ তুলে বলেন, এমন ঘটনা আর কখনো না ঘটার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একজন অভিভাবক, সোনিয়া শারমিন, ঘটনাটি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন এবং শিশুকে নিয়ে স্কুলে এসে ঘটনাটি জানার পর হতবাক হন। তিনি জানান, তিনি প্রায়ই দেরিতে শিশুকে নিতে আসেন এবং শিশুটি অফিস কক্ষে অপেক্ষা করে থাকে; এখন তিনি শিশুকে স্কুলে রেখে যাওয়া নিয়ে ভয় পান।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু, উল্লেখ করেন, সচিবালয়ের কাছাকাছি পল্টনের মতো এলাকায় এমন অমানবিক ঘটনা সহ্য করা যায় না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
পুলিশ ঘটনাটির উপর ফৌজদারি মামলা দায়ের করে এবং তদন্তের জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করেছে। শিশুর মা ও বাবা উভয়কেই তদন্তে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়েছে, এবং স্কুলের সকল শিক্ষক ও কর্মচারীর কাছ থেকে আলাদা আলাদা বিবৃতি নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা অধিদপ্তরও বিষয়টি জানার পর একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে, যা স্কুলের নিরাপত্তা নীতি ও শিক্ষকদের আচরণবিধি পুনর্বিবেচনা করবে। কমিটি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রথম রিপোর্ট জমা দেবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তের পর, পুলিশ মামলাটি স্থানীয় সেশন কোর্টে দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার শুনানি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্ধারিত হয়েছে।
শিশুর মা শেষ পর্যন্ত শিশুর স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার ও মানসিক সান্ত্বনা নিশ্চিত করার জন্য মানসিক পরামর্শদাতা ও চিকিৎসকের সহায়তা নিতে চান। তিনি জানান, শিশুর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমর্থন প্রয়োজন।
এই ঘটনার পর, শিশু সুরক্ষা সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীও বিষয়টি উত্থাপন করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য কঠোর তদারকি দাবি করে। তারা জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো নির্যাতন ঘটলে তা দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।



