সানডান্স চলচ্চিত্র উৎসবে এই বছর প্রিমিয়ার হওয়া ‘সাইলেন্সড’ শিরোনামের ডকুমেন্টারিটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী জেনিফার রবিনসনের কাজকে কেন্দ্র করে তৈরি। পরিচালক সেলিনা মাইলসের নেতৃত্বে তৈরি এই চলচ্চিত্রটি মানহানি মামলাকে নারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়াকে উন্মোচন করে।
মি টু আন্দোলনের পর থেকে নারী অধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানহানি আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই ডকুমেন্টারিটি সেই উদ্বেগকে বাস্তব উদাহরণে রূপান্তরিত করে, যেখানে নারীরা তাদের যৌন নির্যাতন ও হয়রানির অভিজ্ঞতা প্রকাশের পর আইনি চাপের মুখে পড়েছেন।
জেনিফার রবিনসন ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘সাইলেন্সড উইমেন’ বইটি এই চলচ্চিত্রের কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। বইটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে নারীদের মুখোমুখি হওয়া মানহানি মামলার বিশদ বিশ্লেষণ প্রদান করে, যা চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুকে সমৃদ্ধ করেছে।
ডকুমেন্টারিটি দেখায় কিভাবে কিছু দেশে মানহানি আইনকে এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যে, তা নারীর স্বরকে দমন করতে পারে। বিশেষ করে এমন বিধানগুলো যা প্রকাশ্যভাবে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরলে তা মানহানি হিসেবে গণ্য করা হয়, ফলে আইনি শাস্তি ও আর্থিক জরিমানা আরোপিত হয়।
এই ধরনের আইনি প্রয়োগের ফলে উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অজানা নাগরিক পর্যন্ত অনেকেই আদালতে টানা লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছেন। চলচ্চিত্রে এমন কিছু মামলার উদাহরণ দেখানো হয়েছে যেখানে আদালত নারীর সাক্ষ্যকে অবিশ্বাস্য বলে বিবেচনা করে, ফলে তাদের স্বর নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হল আম্বার হার্ডের মামলা, যেখানে তিনি জোনি ডেপের বিরুদ্ধে গৃহস্থালী সহিংসতার অভিযোগ তুলেছিলেন। এই মামলাটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক আইনি লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
রবিনসন যুক্তরাজ্যের ট্রায়ালে হার্ডের আইনগত প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে তিনি মানহানি অভিযোগের মাধ্যমে হার্ডের স্বরকে দমন করার প্রচেষ্টা মোকাবেলা করেন। আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তি ও প্রমাণের বিশ্লেষণ ডকুমেন্টারিতে বিশদভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এই ধরনের মামলাগুলো কেবল ব্যক্তিগত স্তরে নয়, বরং সামাজিক স্তরে নারীর অধিকার রক্ষার জন্য বৃহত্তর চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। মানহানি আইনের অপব্যবহার নারীর আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করে এবং ভবিষ্যতে অন্য নারীদের অভিযোগ তুলতে বাধা দেয়।
সেলিনা মাইলসের মতে, মি টু আন্দোলনের পর থেকে কিছুটা ক্লান্তি দেখা দিলেও, এই সংগ্রাম একবারের ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিক লড়াই। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০১৭ সালের আগে থেকেই নারীরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চেয়েছেন, এবং তা এখনো সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি।
চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন দেশের হেডলাইন-ধরা মামলাকে কেস স্টাডি হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে দর্শকরা মানহানি আইনের বৈশ্বিক প্রভাব বুঝতে পারেন। প্রতিটি কেসে আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সানডান্সে প্রিমিয়ার হওয়ার পর দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ডকুমেন্টারির ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার দৃষ্টিকোণকে প্রশংসা করা হয়েছে, যা নারীর স্বরকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।
এই চলচ্চিত্রটি শুধুমাত্র তথ্য প্রদান নয়, বরং সমাজে মানহানি আইনের পুনর্বিবেচনা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। দর্শকদের জন্য এটি একটি সচেতনতা সৃষ্টিকারী মাধ্যম, যা ভবিষ্যতে নারীর অধিকার রক্ষায় আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানায়।
ডকুমেন্টারির শেষ অংশে রবিনসন ও অন্যান্য আইনজীবীর মন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে তারা মানহানি মামলায় নারীর স্বরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাবগুলো ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ‘সাইলেন্সড’ ডকুমেন্টারিটি মি টু আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে নারীর অধিকার ও মানহানি মামলার জটিলতা উন্মোচন করে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনি সংস্কারের দরকারি দিকগুলোকে আলোকিত করে।



